ইসলামে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ও মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্ব, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:০৮/১১/২০২৫

 


ইসলামে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ও মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্ব

ভূমিকা:
ইসলাম এমন এক সর্বজনীন জীবনব্যবস্থা, যা শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য প্রবর্তিত। এই ধর্মে ন্যায়, সমতা ও মানবাধিকারের যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো দর্শনে এত স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। ইসলাম কখনো অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি জুলুম বা অবিচার করার অনুমতি দেয়নি; বরং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার, সদ্ব্যবহার এবং নিরাপত্তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে।

✓মুসলিম রাষ্ট্রে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অবস্থান

ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিমদের বলা হয় “জিম্মি”। তারা ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের অধীনে বসবাস করে, এবং তাদের জীবন, সম্পদ, ইজ্জত ও উপাসনালয় ইসলামী রাষ্ট্র কর্তৃক সুরক্ষিত থাকে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ঘোষণা করেছেন—

“ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৫৬)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামি পণ্ডিতগণ বলেন, ইসলামের উদ্দেশ্য মানুষকে জোর করে মুসলমান বানানো নয়; বরং যুক্তি, প্রমাণ ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তাদের হৃদয়কে আলোকিত করা।

✓অমুসলিমদের নিরাপত্তা ও উপাসনালয়ের সুরক্ষা

ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো— রাষ্ট্রে বসবাসকারী সকল নাগরিকের ধর্মীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যদি হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ কিংবা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করে, তবে তাদের উপাসনালয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এবং নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মহান নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ নিজে অমুসলিমদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। মদিনার সংবিধানে (Madinah Charter) তিনি মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে পারস্পরিক সহাবস্থানের একটি চুক্তি করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল—
✓১. মদীনা সনদে স্বাক্ষরকারী ইয়াহদী, খ্রীস্টান, পৌত্তলিক ও মুসলমানদের সমন্বয়ে একটি সাধারণ জাতি গঠিত হবে এবং সবার নাগরিক অধিকার সমান থাকবে।
২. সকল সম্প্রদায়ের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অনুমতি থাকবে। কেউ
এতে বোঝা যায় যে, মুসলিম রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামী নীতির অংশ।

✓মুসলিমদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ব

একজন ঈমানদার মুসলিম কখনোই ভিন্ন ধর্মের উপাসনা বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে না। কারণ, ইসলাম একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ দেয় এবং অন্য ধর্মীয় উপাসনা বা প্রতীকের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখা নিষিদ্ধ করেছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।”
(আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১)

অতএব, মুসলমানের দায়িত্ব হলো— নিজের ঈমান ও আমলকে সুরক্ষিত রাখা, তবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সদাচার করা, অন্যায় না করা, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।

✓রাষ্ট্রের কর ও নাগরিকত্বের সম্পর্ক
যেহেতু অমুসলিমরা মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রাস্তা, পানি, প্রশাসনিক সুবিধা ইত্যাদি উপভোগ করে, তাই তারা রাষ্ট্রের প্রতি নির্দিষ্ট কর (যেমন জিজিয়া) প্রদান করে থাকে। এর বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়। এটি কোনো বৈষম্য নয়, বরং দায়িত্ব ও সুবিধার পারস্পরিক সম্পর্ক।

ইসলামী ইতিহাস ও বিবেকের জ্ঞানে বলা যায় কোন বৃদ্ধ যদি হোক সেই ইহুদি অথবা খ্রীষ্টান অথবা অন্য ধর্মাবলম্বী তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা অবশ্যই রাষ্ট্র করবে কেননা রাষ্ট্র তাদের থেকে কর গ্রহণ করে প্রয়োজনে তাদেরকে ভাতার ব্যবস্থাও করবে।
ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা ন্যায়নীতি ও নৈতিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করিয়া তুলিবার জন্য। ইসলামের পতনযুগেও যে এই দিকে যথেষ্ট লক্ষ্য আরোপ করা হইত, ইতিহাস হইতে তাহার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে। হাজ্জাজ বিন্ ইউসুফ তাঁহার শাসন-এলাকায় রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করিবার জন্য তদানীন্তন বাদশাহ আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নিকট অনুমতি চাহিয়াছিলেন। উত্তরে বাদশাহ বলিয়াছিলেনঃ "সাধারণভাবে যাহা পাওয়া যায়, তাহাকেই যথেষ্ট মনে কর, যাহা সহজলভ্য নয়-যাহা লইতে জোর-জবরদস্তি করিতে হয়-তাহার লালসা করিও না। চাষী ও ভূমি মালিকদের জন্যও এমন পরিমাণ সম্পদ থাকিতে দাও যাহা দ্বারা তাহারা স্বচ্ছন্দে জীবন-যাপন করিতে সমর্থ হইবে।"

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে, বাসগৃহ যে জমির উপর থাকিবে, উহার মালিক গরীব হইলে উহার খাজনা আদায় করা যাইবে না।
✓ইসলামী অর্থনীতি মাওলানা মোঃ আব্দুর রহিম -২১৮

এই ঘটনাটি ইসলামী রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত।
✓ধর্মে জবরদস্তি নয়, বরং দাওয়াত ও সদুপদেশ
✓ইসলাম জোরজবরদস্তি করে ধর্ম প্রচার বা প্রতিষ্ঠার কোনো অনুমতি দেয়নি। বরং ইসলাম মানুষের হৃদয়ে সত্যের আলো জাগাতে আহ্বান জানায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“তুমি তোমার প্রভুর পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞার সঙ্গে, উত্তম উপদেশের মাধ্যমে; এবং তাদের সঙ্গে এমনভাবে বিতর্ক কর যা উত্তম।”
(সূরা নাহল: ১২৫)

এই নির্দেশ প্রমাণ করে যে, ইসলাম কখনো শক্তি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজের অবস্থান চাপিয়ে দিতে চায় না। বরং সদ্ব্যবহার, যুক্তি এবং নৈতিকতার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে আনতে চায়।

✓সহাবস্থানের নীতি ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ

ইসলাম সহাবস্থান বা coexistence-এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মুসলমানরা অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। কুরআনে বলা হয়েছে—
✓ “যারা তোমাদের সঙ্গে ধর্মের কারণে যুদ্ধ করে না এবং তোমাদের দেশ থেকে বের করে দেয় না, তাদের সঙ্গে তোমরা সদ্ব্যবহার ও ন্যায়বিচার করবে; নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।”
(সূরা আল-মুমতাহিনা: ৮)

✓ অমুসলিমদের সাথে চুক্তি হলে তারা তার শর্ত ভঙ্গ না করলে তা পূর্ণ করতে হবে-

الا الذين عهدتُم من المشركين ثم لم ينقُصُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ ما قاموا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَى مُدتِهِمْ إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ

"তবে মুশরিকদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছ, অতঃপর তারা তোমাদের চুক্তির কোন দিক ভঙ্গ করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি তাহলে তাদের মেয়াদ পর্যন্ত তোমরা তাদের চুক্তি পূরা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন” (সূরা তাওবা ৪)

এ আয়াত স্পষ্টভাবে দেখায় যে, ইসলাম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে সমর্থন করে। মুসলিম রাষ্ট্রের নীতি হওয়া উচিত—
সকল নাগরিক নিরাপদ থাকবে, কেউ অন্যায় নির্যাতনের শিকার হবে না।”

✓বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামী শিক্ষা প্রয়োগের প্রয়োজন

আজকের পৃথিবীতে ধর্মীয় বিদ্বেষ, সন্ত্রাসবাদ ও জাতিগত বিভেদ যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে ইসলামের এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। মুসলিম রাষ্ট্রের শাসকদের উচিত— সকল নাগরিকের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, যেমনটি ইসলামের ন্যায়নীতিতে শেখানো হয়েছে।

একই সঙ্গে মুসলমানদের মনে রাখা উচিত— নিজের ঈমান অক্ষুণ্ণ রেখে অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করাই ইসলামী আচরণের পরিচয়।

অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা: ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের ধর্ম, জাতি ও বর্ণ নির্বিশেষে ন্যায়, শান্তি ও সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় অমুসলিমদের বলা হয় ‘জিম্মি’, অর্থাৎ তারা মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নিরাপত্তা ও অধিকারভোগের নিশ্চয়তা পায়। ইসলামের ইতিহাসে নবী করিম ﷺ এবং খোলাফায়ে রাশেদীন যুগে অমুসলিমদের প্রতি ন্যায়বিচার ও সহনশীলতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত বিদ্যমান।

ইসলামী শাসনব্যবস্থায় অমুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উপাসনার জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

✓ মুসলিমদের নিরাপত্তা বিধান-
"যদি মুশরিকদের কেউ তোমাদের আশ্রয়প্রার্থী হয় তাহলে তোমরা তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পারে। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছিয়ে দাও” (সূরা তাওবা ৬)।
✓অতএব, ইসলাম অমুসলিমদের তাদের নিজস্ব ধর্ম পালন করতে বাধা দেয় না; বরং তাদের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেয়। এজন্য ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, অমুসলিমদের ধর্মীয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পালনের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং প্রয়োজনে তাদের মধ্য থেকেই সৎ, যোগ্য ও প্রতিনিধিত্বমূলক নেতাদের নির্বাচন করে প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করা।
এমন নেতৃত্বের মাধ্যমে অমুসলিম সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শৃঙ্খলাভাবে সম্পাদন করতে পারে, এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পুলিশ প্রটেকশন বা নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নিশ্চিত হয়। এতে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হয় এবং রাষ্ট্রে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে একটি কথা স্মরণ রাখা দরকার ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনারায় গিয়ে মুসলিম কোন ব্যক্তি যদি এই কাজ করে তাহলে মুসলমানরা ভাববে এটা হয়তো বৈধ। যাওয়া তো উচিত হবে না।
যে বিজাতির অনুসরণ করে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হাদিসে এমনটাই বর্ণনা করা হয়েছে।

✓ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪০৩১
হাদিসের মান: হাসান সহিহ

ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার নিদর্শন নয়, বরং মানবতার প্রতি মহানুভবতার বাস্তব প্রতিফলন। ইসলামী ন্যায়বিচারের এই চেতনা আজও মানবজাতির জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ।

✓উপসংহার

ইসলাম শান্তি, ন্যায় ও মানবতার ধর্ম। মুসলিম রাষ্ট্রে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার রক্ষা করা কোনো দয়া নয়, বরং ইসলামের অপরিহার্য নির্দেশ। তাদের উপাসনালয়, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে একজন ঈমানদার মুসলমান কখনোই অন্য ধর্মের অনুকরণ বা সহায়তা করতে পারে না; বরং সত্য ও সৎ পথে ডাকার চেষ্টা করবে।

ইসলামের সৌন্দর্যই হলো— ন্যায় ও করুণার মাধ্যমে বিশ্বজগতে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

✍️মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।
তারিখ:০৮/১১/২০২৫
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ