✍️ছোটগল্প: অনটনে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়।

 


✍️ছোটগল্প: অনটনে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়।


গ্রামের নাম সিরাজগঞ্জের তারাশ পূর্বপাড়া। সবুজে ঘেরা, শান্ত, নিরিবিলি এক গ্রাম। চারদিকে গাছগাছালি, নদী, নালা, বিল—প্রকৃতির রূপ যেন এখানে মাটির গন্ধে মিশে আছে। গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে সরু এক নদী—মধুমতি খাল। বর্ষায় তার জল ফুলে উঠে, গ্রামের মাঠে ছড়িয়ে যায়; আবার শীতে শুকিয়ে ছোট ছোট ধারা হয়ে বয়ে চলে। নদীর ধারে আছে পুরনো স্কুলটা—পূর্বপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়। টিনের ছাউনি, মাটির বারান্দা, আর মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বটগাছ—এই স্কুলই ছিল গ্রামের ছেলেমেয়েদের স্বপ্নের সূচনা।

সেই স্কুলেই পড়ত গ্রামের এক দরিদ্র অথচ মেধাবী ছেলে—রায়হান। ছেলেটির বাবা বছর কয়েক আগে মারা গেছেন। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। ঘর বলতে টিনের চালা, খড়ের বেড়া, আর এক কোণে মায়ের পুরনো চৌকি। তবু সেই ঘরে আশা-ভরসা ছিল অফুরন্ত।

রায়হান প্রতিদিন সকালে খালি পায়ে নদীর ঘাট দিয়ে স্কুলে যেত। পথে হঠাৎ কখনো থেমে জলে পা ডুবিয়ে বসত, কখনো মাঠের শাপলা ফুল ছিঁড়ে হাতে নিয়ে হাসত। তার স্বপ্ন ছিল বড়—“একদিন শহরে পড়বে, শিক্ষক হবে, মা আর গ্রামের মানুষকে গর্বিত করবে।”

পাশের বাড়ির নাজু ছিল তার সহপাঠী। নাজু হাসলে মনে হতো, যেন সকালবেলার সূর্যের আলো নদীর জলে পড়ে ঝলমল করছে। প্রথমে দু’জনের বন্ধুত্ব, তারপর ধীরে ধীরে সেই বন্ধুত্বে মিশে গেল কিশোর হৃদয়ের মায়া, লজ্জা, আর ভালোবাসার কোমল ছোঁয়া।

একদিন বৃষ্টির বিকেলে স্কুল ছুটি হল। বৃষ্টি থামতেই দু’জনে নদীর ঘাটে ছাতা হাতে দাঁড়াল। রায়হান বলল,
—“নাজু, যদি আমি একদিন কিছু হতে পারি, তোমাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করব।”
নাজু হেসে বলল,
—“তুমি হবে রায়হান, আমি বিশ্বাস করি।”

কিন্তু জীবন যে এত সহজ নয়, তা তখনো দু’জনেই জানত না। এভাবেই জীবনের প্রতিটি দুঃখের জলকণায় ভরে ওঠে রায়হানের জীবন।

SSC পরীক্ষার পর রায়হান ভালো ফল করলেও টাকার অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারল না। মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বন্ধুরা কলেজে ভর্তি হলো, শহরে চলে গেল—কিন্তু রায়হানের দিন কাটতে লাগল বাজারে দোকানের কাজে।

এমন সময় গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক নকিব উদ্দিন সাহেব একদিন রায়হানকে ডেকে বললেন,
—“বাবা, অনটনে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়। কিন্তু মনে রেখো, সফলতার আলো ফুটলে সেই জানালাই আবার খুলে যায়। মানুষ হও, তারপর দেখবে—সব ভালোবাসা, সব সম্মান তোমার পিছু নেবে।”

রায়হান নীরবে শুনে চোখ মুছে ফেলল। সেদিনই সে প্রতিজ্ঞা করল—জীবনের পরাজয় মেনে নেবে না। কাশি ও সর্দি লাগলে যেমন নাপা ও কাঁশের বড়ি খেতে হয়। তেমনি দিন যায় রায়হান সফলতার সিঁড়ি বেয়ে একদিন চাকরির  আশায় ঢাকায় পাড়ি জমায়। কিছু লোক দালালি করে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে থাকে যেমন আদম ব্যবসা, পশুর দালালি ও নানান ধরনের দালাল আমাদের সমাজে রয়েছে কেউ কেউ হাসপাতালেও দালালি করেন। এই দৃশ্য তার চোখে বারবারই ঘুরপাক খায়।

দিন যেতে লাগল। রায়হানের ঢাকায় গেল, ছোটখাটো চাকরি নিল। সকালে কাজ, রাতে পড়াশোনা। কষ্ট ছিল, কিন্তু আশা ছিল আরো বড়। রাত জেগে পড়াশোনা করে একদিন সে সরকারি বৃত্তি পেল। পরে এক সময় নিজেই ছোট ব্যবসা শুরু করল—একটা বইয়ের দোকান, পরে প্রিন্টিং প্রেস। জীবনের গতি বদলাতে লাগল।

এদিকে নাজুর জীবনও বদলে গেল। তার বাবা শহরের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন মেয়েকে। নাজু কান্নায় ভেসে গেলেও সমাজের বাধা অমান্য করার শক্তি তার ছিল না।

বছর কেটে গেল অনেক। রায়হান এখন সফল মানুষ। তার নিজস্ব ব্যবসা, শহরে বাসা, গাড়ি, সম্মান—সবই আছে। কিন্তু মনের ভেতর কোথাও একটা শূন্যতা, পুরনো দিনের টান রয়ে গেল।

এক বর্ষার বিকেলে অনেক বছর পর রায়হান ফিরে এল পূর্বপাড়ায়। নদীর ঘাটের পাশের পুরনো বটগাছটা তখনো দাঁড়িয়ে আছে। স্কুলের টিনের চালা এখনো আগের মতো, শুধু বারান্দার দেয়ালে নতুন রঙের ছোঁয়া।

মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে রায়হান দেখল হরিধানের মাঠ  ও সবুজে ঘেরা গাছপালা পুকুরে সাদা শাপলা ইত্যাদি আবার লক্ষ্য করলো—মেয়েদের দল স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফিরছে। দূরে একজন নারী তার ছোট ছেলেকে নিয়ে হাঁটছে। চেনা ভঙ্গি, পরিচিত মুখ। কাছে গিয়ে তাকাতেই রায়হান বুঝল—সে নাজু।তার দুঃখে চোখের কনায় ভরে গেল পানি।

চোখাচোখি হতেই দুজনেই থেমে গেল। দীর্ঘ নীরবতার পর নাজু বলল,
—“তুমি? কত বছর পর!”
রায়হান মৃদু হেসে বলল,
—“হ্যাঁ, আমি ফিরেছি। নকিব সাহেবের কথা মনে পড়ে গেল—অনটনে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়। এখন জানালাটা খোলা, কিন্তু কেউ আর আসে না।”
রায়হান বলল -
"আমার মনের জানালা খোলা দেখলো না কেউ এসে
দুঃখ ভরা জীবন নিয়ে গেলাম ভালোবেসে।"

নাজুর চোখে জল এসে গেল। সে নিচু স্বরে বলল,
—“তুমি সফল হয়েছো, এটাই আমার শান্তি।”

দুজনেই কিছুক্ষণ নীরবে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসে তখন কাশফুল দুলছে, সূর্যের আলো নদীর জলে সোনালি ছটা ফেলেছে।

রায়হান বলল,
—“জীবন নদীর মতো, নাজু। বাঁক নেয়, শুকিয়ে যায়, আবার বন্যায় ভরে ওঠে। অনটন থামাতে পারে না, শুধু মানুষকে শেখায়—কষ্টের জলে ভেসেও বাঁচতে হয়।”

নাজু মৃদু হেসে ছেলেকে কোলে তুলে বলল,
—“তুমি তোমার পথ খুঁজে পেয়েছো, এটাই সবচেয়ে বড় জয়।”

রায়হান নীরবে মাথা নাড়ল। তারপর ধীরে ধীরে নদীর ধারে হেঁটে চলে গেল। বাতাসে তার কণ্ঠ মিলিয়ে গেল—
“অনটনের জানালা খুলে দিয়েছি আমি, এখন তাতে আলো আসে—ভালোবাসার, সাফল্যের, আর জীবনের।”

নদীর জলে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। চারপাশে সন্ধ্যার আলো ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের শিশুরা খেলা থামিয়ে মসজিদের আজানের দিকে তাকাচ্ছে। আর ভাবছে জীবনের সঙ্গিনীর খুবই প্রয়োজন রয়েছে যে সঙ্গিনী রবে প্রতিটি অনুভবে জান্নাতের সহচর হিসেবে।

আর দূরে, নদীর ধারে, পুরনো বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে এক তরুণের মুখে ফুটে উঠল এক শান্ত হাসি।

🖋️শেষ কলমে,
✍️মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
🌺প্রভাষক : হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।
🕐১১/১০/২০১১
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL ISLAM.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ