ছোট গল্প: ঈমানের ক্যান্সার, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:১১/১১/২১

ছোট গল্প: ঈমানের ক্যান্সার


ছোটনপুর গ্রাম—যেন আল্লাহর এক অনন্য সৃষ্টি। চারদিকে অসীম সবুজ, কচি ঘাসের গন্ধে ভরপুর মাঠ, মাঝখান দিয়ে সরু খাল—তার স্বচ্ছ জল ভোরের আলোয় চিকচিক করে। প্রভাতের প্রথম কলরব শুরু হয় ঘুঘুর ডাকে, সঙ্গে ইমামের সুমধুর আজান। এমন মনোরম পরিবেশে বড় হয়েছে সলিমুদ্দিনের একমাত্র ছেলে—জাটকা মিয়া।

জাটকা ছোট থেকেই নরম স্বভাবের, শিষ্ট, দয়ালু। সলিমুদ্দিন একদিন গ্রামের চায়ের দোকানে বসে বলছিলেন,
—“দেখো ভাইসব, আমার জাটকা ছেলে বড় হয়ে আল্লাহর দ্বীন শিখবে, মানুষকে হেদায়েতের পথে ডাকবে। এই ছেলে দিয়ে আল্লাহ ভালো কাজ করাবেন।”
কেউ তামাসা করে বলল,
—“এই যুগে কে আবার দাওয়াতি কাজ করে? টাকা কামানোর যুগ, নাম-যশের যুগ।”
কিন্তু সলিমুদ্দিন দৃঢ় ছিল।

তবে সমাজ সবসময় ভালো মানুষের পক্ষে থাকে না। ছোটনপুরেও তাই হলো।

১. সমাজের পরিবর্তিত চেহারা

ছোটনপুর একসময় ছিল শান্ত। কিন্তু ধীরে ধীরে বদলে গেল। পাশের বাজারে গজিয়ে উঠলো হোটেল, সেখানে চলছে অবৈধ সিনেমা, অশ্লীল নাটক। কিশোর-যুবকরা সন্ধ্যায় দল বেঁধে সেখানে ঢুকে পড়ে। রাস্তার মোড়ে নেশার আড্ডা। গ্রামের মানুষ বলতে লাগলো—
“এ গ্রামে যেন সমাজের ক্যান্সার ধরেছে।”

জাটকা এসব দেখে ভেতরে ভেতরে পুড়তে লাগল। সে ভাবলো, “এতো সৌন্দর্যের গ্রাম, অথচ এই নোংরা কাজের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তরুণদের ভবিষ্যৎ।”

এই সময়ই গ্রামের সম্মানিত আলেম—মাওলানা ফরিদ উদ্দিন—জাটকার দিকে ভরসার হাত বাড়ালেন।

এক সন্ধ্যায়, খালের ধারে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বললেন,
—“জাটকা ভাই, ভয় পেয়ো না। রাসূল ﷺ-এর যুগেও তো দাওয়াতের কাজ সহজ ছিল না। জাহিলিয়াতের মানুষের অন্তরে ছিল কঠিন রোগ… যেন ঈমানের ক্যান্সার। যেমন শরীরের ক্যান্সার সারা দেহকে ধ্বংস করে, ঈমানের ক্যান্সারও অন্তরকে ধ্বংস করে দেয়। চিকিৎসা নেই, ওষুধ নেই—কারণ মানুষ নিজের ভুলকেই ঠিক মনে করে বসে থাকে।”

তার কথা জাটকা যেন প্রাণভরে শুনছিল।
হঠাৎ মনে হলো, দিগন্তে ভোরের রং ফুটে উঠছে… যেন আশার আলো।

২. গ্রামের চরিত্ররা: গনি মিয়া ও তোতলা সলিমুদ্দিন

জাটকার গ্রামের এক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ ছিলেন গনি মিয়া। বয়স বেশি, অভিজ্ঞতা অসীম, রাগও একটু বেশিই। কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি সৎ। অনেকে তাকে সমীহ করত, আবার খোশামুদে মানুষ তাকে ডাকত "গুরু" বলে।

একদিন বাজারে গিয়ে দেখা গেল তোতলা সলিমুদ্দিন গনি মিয়াকে দেখতে পেয়ে বলছে—
—“এই যে… বাই গুইনা… বাই গুইনা…”
গনি মিয়া রেগে আগুন!
—“এই কী বলছো? আমি গনি, গুইনা নয়!”

তারপর সে ক্ষোভ নিয়ে বলল,
—“তোতলা যেমন তার তোতলামি সহজে ছাড়তে পারে না, তেমনি সমাজের অসভ্য মানুষগুলোও সহজে ভালো হয় না।”
তার কথার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছন্দে ছন্দে বললেন—

"আমিতো কই না গো কথা কিতাবে যে কয়,
জন্মে যাহার দোষ পরেছে—সে তো ভালো নয়।"

জাটকা এগিয়ে এসে শান্ত করলো। বলল—
—“গনি ভাই, মানুষ যদি পরিবেশ পায়, ভালো সঙ্গ পায়, জ্ঞান পায়—তবে অবশ্যই বদলাতে পারে। আমরা সবাই মিলে যদি এই পার্কে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা, হোটেলে অবৈধ সিনেমা, রাস্তার অপসংস্কৃতি—এসব প্রতিরোধ করি… মানুষ একটু হলেও ভাববে।”

সে আরও বলল—
—“যে খারাপ কাজ শুরু করে, সে যেমন গুনাহ পায়, তেমনি যারা তার অনুসরণ করে, তারাও গুনাহ পায়—আর সেই গুনাহের অংশ প্রথম মানুষটাও পায়। এভাবে গুনাহ ছড়ায়।”

গনি মিয়ার চোখে যেন প্রথমবারের মতো আলো ফুটে উঠল।

৩. দাওয়াতের যাত্রা শুরু

পরের ভোরে, গ্রামের খালের ধারের সবুজ ঘাস এখনো শিশিরভিজা। বিলের পানিতে সূর্যের প্রথম কিরণ পড়ে সোনা ঝলমল করছে। সেই দৃশ্যের মাঝেই জাটকা, গনি মিয়া এবং তোতলা সলিমুদ্দিন—তিনজন দাঁড়িয়ে আলোচনা করছে।

পাখিরা কিচিরমিচির করছে, তালগাছের মাথায় বাতাসের হালকা দোলা—গ্রামের সকাল যেন তাদের দাওয়াতি যাত্রাকে স্বাগত জানাচ্ছে।

জাটকা বলল—
—“আজ থেকে আমরা শুরু করবো। এক বাড়ি, এক পরিবার, এক তরুণ—যাকে পাই তাকে বুঝাবো। মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকব।”

তারা শুরু করলো।

প্রথম দিন ১২ জনকে বোঝাল।
দ্বিতীয় দিন গেল ২০ জন।
খালের পাড়ে, বাজারের চা দোকানে, পথের ধারে—যেখানে পেল সেখানেই বোঝাল।

মানুষ ধীরে ধীরে ভাবতে লাগলো—"এ ছেলেটা সত্যি কথা বলছে… আমরা কি আসলেই ভুল পথে যাচ্ছি?"

৪. সংঘাতের সূচনা: হাজী জসের

কিন্তু সমাজের সব লোক তো ভালো নয়।
গ্রামের বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি— জসের মিয়া। মানুষ তাকে বলে—চাঁদাবাজ, বাটপাড়, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎকারী। তার হোটেলে অবৈধ সিনেমা চলে। এখান থেকেই সে ভোটের প্রচার চালায়।

 জসের মিয়া খবর পেল যে জাটকার দাওয়াতি কাজ তার ব্যবসার ক্ষতি করছে।
সে উত্তেজিত হয়ে বলল—
—“এ সামান্য জাটকা মিয়া আমাদের বাধা দিবে? আমরা হোটেল বন্ধ করবো? ভোটের সময় এদের টেনে নিয়ে আসি, খাবার দিই, সিনেমা দিই—তাই তো এরা আমাদের কথা শোনে! এই ছেলে সব নষ্ট করে দিচ্ছে!”

তার সাঙ্গপাঙ্গরা জড়ো হয়ে বলল,
—“একে দমন করতে হবে। না হলে গ্রামের যুবকদের আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।”

গ্রাম আবার নেমে গেল অস্থিরতার দিকে।

৫. মাওলানা ফরিদ উদ্দিনের আগমন

এই সময় শহর থেকে ছোটনপুরে এলেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন।
গ্রামবাসীরা যেন নতুন আলো পেল।

সন্ধ্যায় খালের ধারে, নরম বাতাস বইছে। গাছের পাতা মৃদু আওয়াজ তুলে সুর বাজাচ্ছে। সেখানে বিশাল এক মাহফিল বসলো। মানুষের ঢল নেমে এল।

মাওলানা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—

—“হে মানুষ! তোমাদের চাঁদাবাজি, ভন্ডামি, দুষ্কর্ম সমাজটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। তোমাদের হাতই তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে কিয়ামতের দিন। আল্লাহর দরবারে কারো পালানোর জায়গা থাকবে না। এখনো সময় আছে—ফিরে আসো আলোর পথে।”

তার বক্তব্যে যেন মানুষের অন্তর কেঁপে উঠলো।
 জসের মিয়া ও ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। সে দেখল তার অধীনস্থ কিছু ছেলে কাঁদছে, মন নরম হয়ে যাচ্ছে।

মাওলানা আরও বললেন—
—“প্রতিটি মানুষ ফিতরাতের উপরই জন্মায়—পরিষ্কার, পবিত্র। পরিবেশ তাকে নষ্ট করে। আসুন, পরিবেশ বদলাই। সমাজের ক্যান্সার দূর করি। আল্লাহর দিকে ফিরে আসি।”

এ যেন ছোটনপুরের জন্য নতুন সূর্যোদয়।

৬. মানুষের পরিবর্তনের শুরু

✓পরের কয়েক সপ্তাহে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল:
✓হোটেলের অশ্লীল সিনেমা বন্ধ হলো।
✓রাস্তার মোড়ের নেশা-আড্ডা ছত্রভঙ্গ হলো।
✓কিছু চাঁদাবাজ ছেলেরা ক্ষমা চেয়ে কাজ ছেড়ে দিল।
✓বাজারে ইসলামি আলোচনা বাড়ল।
✓তরুণরা আবার সকালের কাজে, খেলাধুলায়, মসজিদে ফিরতে শুরু করল।
✓বিলের ধারে ভোরের হাঁটায় আবার সলিমুদ্দিনের তিলাওয়াত ভেসে আসে।
✓খালের জলে কচুরিপানা আবার স্বাভাবিক ছন্দে দোল খায়।
✓গ্রামের সৌন্দর্য যেন কেবল প্রকৃতিতে নয়—মানুষের হৃদয়ে ফুটল।

জাটকা একদিন খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে বলল—
—“দেখলেন গনি ভাই? মানুষ বদলায়। শুধু সঠিক দাওয়াত, সঠিক পরিবেশ দরকার।”
গনি মিয়া হাসলেন—
—“হাইরে জাটকা ভাই, তোমার কথাই সত্যি হলো। আমার সেই কবিতাটা ধরা পড়লো ভুল!”
তোতলা সলিমুদ্দিন বলল,তাই গনু ভাই,এই জন্যই তুমি তো গুরু।

৭. শেষ সঙ্কট ও সমাধান

হাজী জসের প্রথমে মানতে চায়নি।
সে ভেবেছিল—মাহফিলের উত্তেজনা কেটে গেলে মানুষ আবার আগের মতো হয়ে যাবে।

কিন্তু সেটা হলো না।
মানুষ সত্যিই বদলাতে লাগলো।

এক সন্ধ্যায় জসের মিয়া একা বসে থাকল তার ফাঁকা হোটেলে।
বাইরে খালের ওপাশের জোনাকির আলো—দেখে মনে পড়লো শৈশব।
মাওলানা ফরিদের কণ্ঠ যেন কানে বাজতে লাগলো—
“তোমার হাত তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।”

সেই রাতে জসের কান্না করলো।
সুবহে সাদিকের আজানে সে মসজিদে এসে দাঁড়াল।
গ্রামবাসী অবাক—
জসের মিয়া কাঁদছে, ক্ষমা চাইছে।

সে বলল—
—“আমি ভুল করেছি। আমি সমাজে নোংরা ছড়িয়েছি। আজ থেকে আমি বদলে যাবো। কোরআনের পথে ফিরবো।”

মানুষ তাকিয়ে রইল বিস্ময়ে।
কেউ ভাবেনি এই পরিবর্তন সম্ভব।

৮. সমাজে আলোর পথ

পরিবর্তন থামল না।
গ্রামের কিশোররা মিলাদ পাঠ করছে, কুরআন শেখছে।
বাজারের দোকানগুলোতে হারাম জিনিস কমে গেল।
হোটেলে এখন চলতে থাকে ইসলামি বক্তৃতা, সীরাত পাঠ।

বিলের ধারে বাঁশবনের মধ্য দিয়ে বাতাস বয়ে যায়—এক ধরনের শান্তির অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে।
মসজিদ থেকে নিত্যদিন সুন্দর কুরআন তিলাওয়াত ভেসে আসে।

গ্রামের মানুষ বলল—
“এ গ্রামে ঈমানের ক্যান্সার ছিল… আল্লাহর কৃপায় তা সেরে গেছে।”

৯. শেষ দৃশ্য: আলোর পথে যাত্রা

এক ভোরে, প্রভাতের আলো ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ছোটনপুরে।
খালের জলে রোদের লালচে প্রতিফলন, চারদিকে ধানক্ষেতের বাতাসের দোলা, বিল থেকে উড়ে আসা বকপাখির দল।

জাটকা, গনি মিয়া, তোতলা সলিমুদ্দিন আর মাওলানা ফরিদ উদ্দিন হাঁটছেন খালের পাড় ধরে।

মাওলানা বললেন—
—“দেখলে জাটকা? একজন মানুষ সত্য হলে, তার কথা যদি কুরআন-সুন্নাহর উপর দাঁড়ানো হয়—তবে সমাজ পাল্টাতেই হয়।”

জাটকা বিনয়ের সঙ্গে বলল—
—“হুজুর, বদলেছেন আল্লাহ। তিনি যদি না চাইতেন, কিছুই হতো না।”

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন হাসলেন।
বাতাসে তখন মিশে আছে শিশির-স্নিগ্ধ ভোরের সুবাস।
নতুন দিনের সূচনা—নতুন ঈমানের সজীবতা।
ছোটনপুর যেন ফিরে পেয়েছে তার হারানো আলো।

আর জাটকা বুঝল—
আল্লাহর পথে চললে, সত্যের পথে ডাকলে, সমাজ অপরিবর্তনীয় নয়—পরিবর্তন অবশ্যই আসে।

🖋️শেষ কলমে, মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।
©️তারিখ:১১/১১/২৩
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ