মেয়ের প্রাপ্তবয়স হওয়ার পর বিবাহ না দেওয়া: সামাজিক বাস্তবতা ও দায়বদ্ধতা।
🖋️মেয়ের প্রাপ্তবয়স হওয়ার পর বিবাহ না দেওয়া: সামাজিক বাস্তবতা ও দায়বদ্ধতা।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে একটি প্রবচন প্রচলিত— “চোখে কালো চশমা লাগিয়েছে।” বৃহত্তর অর্থে এর দ্বারা বোঝানো হয় এমন পরিবারকে, যারা তাদের মেয়ের প্রাপ্ত বয়স হওয়ার পরও বিবাহের বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে, অথবা দায়িত্ব এড়িয়ে চলে। সমাজের মুরোব্বিরা মনে করেন, যুগের বাস্তবতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং তরুণ-তরুণীদের নানা অপকর্ম দেখে যাদের হৃদয় সজাগ হয় না, তারাই এই অবহেলার পথে চলে।
১. সামাজিক বাস্তবতা: সময়ের পরিবর্তন ও ঝুঁকির মাত্রা
আজকের সমাজ যোগাযোগমাধ্যম, প্রযুক্তি এবং পরিবর্তিত জীবনধারার কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত। কিশোর-কিশোরীরা সহজেই বিভিন্ন প্রলোভন, অনৈতিক সম্পর্ক এবং বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। পরিবার যতই সুরক্ষিত পরিবেশ তৈরি করুক, সমাজের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
যখন বাবা-মা মেয়ের জন্য বিবাহকে অগ্রাধিকার না দিয়ে ‘সঠিক সময়’ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকে—
✓কখনো অতিরিক্ত উচ্চ প্রত্যাশা,
✓কখনো বাহ্যিক চাকরি-সম্পন্ন পাত্রের খোঁজ,
✓কখনো ‘আরও একটু সময় দেখবো’—এই ভাবনা,
—এসবই কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব তৈরি করে।
এর ফলে পরিবার নিজেই অজান্তে ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। মেয়ের মানসিক নিরাপত্তা, ধর্মীয় জীবন, সামাজিক সুনাম—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
২. ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: বিবাহ দেরি করার সতর্কবার্তা
ইসলামে ছেলে বা মেয়ে—উভয়ের জন্য বিবাহকে উৎসাহিত করা হয়েছে, শুধুমাত্র নৈতিক সুরক্ষা নয় বরং সামাজিক স্থিতি বজায় রাখার জন্যও। হাদিসে এসেছে:
> “আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা যে ব্যক্তির দীনদারী ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছ তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সাথে বিয়ে দাও। তা যদি না কর তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।
✓ মিশকাত (২৫৭৯)
✓জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস নং ১০৮৪
এখানে ধর্মীয় ও নৈতিক মানদণ্ডকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে, বাহ্যিক সম্পদ বা চাকরির মান নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক পরিবার ক্ষমতা, সম্পদ বা উচ্চবিত্ততার দিকে অতিরিক্ত নজর দেয়, যার কারণে বিবাহ বিলম্ব হয়। ফলে যে ফিতনা ও সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে, ঠিক সেই সমস্যারই জন্ম হয়।
৩. মুরোব্বিদের দৃষ্টিভঙ্গি: অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ
বাংলাদেশের সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠরা অনেক বিষয় সতর্কতার সাথে দেখেন। তারা জানেন, সন্তানরা যতই আদর্শে বড় হোক, সমাজের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। তাদের বক্তব্য—
“সমাজের দিকে তাকাও, সময়টাকে বোঝো। চোখে কালো চশমা লাগিয়ে থাকা যাবে না।”
এই কথার ভেতরে আছে অভিজ্ঞতার গভীর শিক্ষা—
যে বাবা-মা কন্যার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন, তারা বিবাহের বাস্তবিক প্রয়োজনকে অস্বীকার করতে পারে না।
আজকে আমাদের সমাজের কিছু অশ্লীল কর্মকাণ্ড দেখে অন্তত বাবা মায়ের বুঝা উচিত। ছোট বেলায় একটি গান শুনতাম যদিও খারাপ
সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরতে বাধ্য হলাম -
গানের মধ্যে আগে যে কথা ফুটে উঠেছে অবাধ্য তরুণীর মুখে -
আমার বাবাকে একটি চশমা কিনে দে,
আমি এত বড় হয়েছি তবু দেয়না কেন বিয়ে,
আমার বাবাকে একটি চশমা 👓 কিনে দে।
মেয়ে লোক লজ্জার ভয়ে মা বাবাকে বলতে পারেনা।
ফলশ্রুতিতে তারা বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
৪. বিবাহ বিলম্বের পরিণতি: মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক ক্ষতি
বিবাহ বিলম্বিত হলে—
✓মেয়ের মানসিক চাপ বাড়ে।
✓পরিবার সামাজিকভাবে অযথা সমালোচনার শিকার হয়।
✓অনিচ্ছাকৃতভাবে সমাজে বিভিন্ন ভুল ধারণা জন্ম নেয়।
✓কখনো অনৈতিক সম্পর্ক, ভুল সিদ্ধান্ত বা সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়।
✓সমাজের মুরোব্বিরা যখন সতর্ক করেন, তা মূলত ভবিষ্যতের ঝুঁকি এড়ানো এবং পরিবারের মর্যাদা সংরক্ষণের জন্যই।
৫. সমাধানের পথ: দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও বাস্তবিক সিদ্ধান্ত
মেয়ের বিবাহে দেরি কমানোর জন্য—
১) ধর্মীয় মানদণ্ডে উপযুক্ত পাত্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
২) বাহ্যিক চাকরি, সম্পদ, বাড়তি সম্পদের লোভ পরিত্যাগ করতে হবে।
৩) পরিবারে খোলামেলা আলাপের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
৪) কন্যার মতামত, মানসিক প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনা করতে হবে।
৫) অভিভাবকদের উচিত সমাজের বাস্তবতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে সজাগ থাকা।
✓শেষ কথা
সমাজ বদলাচ্ছে, ঝুঁকি বাড়ছে, নৈতিক সুরক্ষা দুর্বল হচ্ছে—এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। তাই কন্যার বিবাহের বিষয়ে বাবা-মাকে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চোখে কালো চশমা—এই কথাটি আসলে এক ধরনের সতর্কবার্তা; সময়, সমাজ ও বাস্তবতার আলোকে সতর্ক ও জাগ্রত হওয়ার আহ্বান।
পরিবার যত দ্রুত বাস্তবতা বুঝবে, তত দ্রুত কন্যার সম্মান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।
🖋️রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
💐প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।
তারিখ:১৪/১১/২০২৫
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন