গল্প: “আলোর পথের সন্ধান”, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:১৯/১১/২০২৫
গল্প: “আলোর পথের সন্ধান”
বাংলার এক নিরিবিলি গ্রাম—খালের পাড়ে গাছগাছালির শান্ত ছায়া মেখে থাকা জামালপুরের কৈডোলা উত্তর পাড়া গ্রাম । দীর্ঘদিন ধরে এ গ্রামে একটি সমস্যা প্রকট রূপ নিয়েছিল—ভিক্ষাবৃত্তি। গ্রামের হাটে, মসজিদের সামনে, এমনকি স্কুলের গেটে প্রতিদিন কিছু লোক হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকত। অনেকে সক্ষম হলেও ভিক্ষাকে সহজ উপায় মনে করত; কেউ আবার দুর্বলতা কিংবা রোগে আক্রান্ত হয়ে সত্যিই অসহায় ছিল।
সবার মনেই প্রশ্ন—এ সমস্যার সমাধান কী?
এই সময় গ্রামের সম্মানিত আলেম মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম উদ্যোগ নিলেন সমস্যাটি ইসলামের আলোকে সমাধানের।
এক
একদিন জুমার পর মসজিদের বারান্দায় গ্রামের মানুষ জড়ো হলো। মাওলানা সাহেব ধীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন—
“ভাইয়েরা, ভিক্ষাবৃত্তি কোনো মুসলমানের সম্মানের কাজ নয়। নবী করীম (স) বলেছেন—
‘যে ব্যক্তি অযথা মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করে, কিয়ামতের দিনে তার মুখে এক টুকরো গোশতও থাকবে না।’
ইসলাম মানুষকে কর্মঠ হতে শেখায়, আত্মসম্মান রক্ষা করতে শেখায়। কিন্তু একই সাথে বলে—যে সত্যিই অসহায়, তার জন্য সাহায্য নেওয়া বৈধ। আজ আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দেখানো দুইটি পথ—প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন—দু’টিই আমাদের গ্রামে চালু করব।”
মানুষ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
দুই
সেই দিন থেকেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ শুরু হলো।
মাওলানা সাহেব প্রথমে গ্রামের যুবকদের জড়ো করলেন। তিনি বললেন—
“ভিক্ষা সমাধান নয়; সমাধান হলো কর্মসংস্থান। রাসূল (স) বলেছেন,
‘তোমাদের কেউ যেন রশি নিয়ে কাঠ কাঁধে করে এনে বিক্রি করা উত্তম, মানুষের কাছে চাওয়ার চেয়ে।’”
যুবকদের মাঝে এটা নতুন স্ফূর্তি এনে দিল। তারা সিদ্ধান্ত নিল—গ্রামে সচেতনতা গড়ে তুলবে।
হাটে-ঘাটে, দোকানে-দোকানে গিয়ে মানুষকে বোঝাতে লাগল—
“ভাই, ভিক্ষা নয়; কাজই করবে আমাদের উন্নতি।”
“যারা সক্ষম, তারা কাজ করুন; যারা অক্ষম, তাদের দেখভাল করবে সমাজ।”
এভাবে ধীরে ধীরে মানুষের মনে ভিক্ষাবৃত্তির প্রতি ঘৃণা তৈরি হতে শুরু করল।
তিন
এরপর পুনর্বাসনমূলক কর্মসূচি শুরু হলো।
মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম গ্রামের কিছু সক্ষম ভিক্ষুককে ডেকে এনে বললেন—
“তোমরা ভিক্ষা ছাড়ো। তোমাদের কাজে লাগানোর ব্যবস্থা আমি করব।”
গ্রামের ধনী মানুষদের কাছে গিয়ে তিনি বললেন—
“আপনারা সাদাকা, যাকাত—সবই দেন। এবার একটি স্থায়ী কাজে এগিয়ে আসুন। একজন ভিক্ষুক যদি কাজ শেখে, সে ভবিষ্যতে কারো মুখাপেক্ষী থাকবে না।”
তার আহ্বানে সাড়া মিলল।
কেউ দর্জির দোকানে চাকরি দিল, কেউ কৃষিকাজে সহকারী নিল, কেউ আবার মুরগি পালন বা হাঁস-মাছ চাষের জন্য পুঁজি দিল।
একজন ভিক্ষুক আলতাফ বলল—
“হুজুর, আমি এত দিন ধরে হাত পেতে চলেছি। আজ কাজ পেলাম। আমার মনে হচ্ছে, আমি আবার মানুষ হয়ে গেলাম।”
মাওলানা সাহেব চোখ ভিজে বললেন—
“বেটা, মানুষ তো তুমি আগেই ছিলে। আজ সম্মান ফিরল তোমার কাছে।”
চার
এরপর এল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ—অক্ষমদের পুনর্বাসন।
গ্রামে তিনজন বৃদ্ধ ছিলেন যারা চলাফেরা করতে পারেন না। তাদের সাহায্যের জন্য মাওলানা সাহেব যাকাতের সঠিক ব্যবস্থা করলেন।
রাসূল (স)-এর বাণী তিনি সবার সামনে পড়লেন—
যাকাত হচ্ছে গরিব, অভাবী ও অসহায়দের জন্য।
গ্রামের কয়েকজন ধনী ব্যক্তি স্থায়ীভাবে তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিলেন।
তাদের জন্য খাবার, ওষুধ, পোশাক—সব কিছু নির্দিষ্টভাবে ব্যবস্থাপন করা হলো।
এভাবে যারা কাজ করতে পারে না, তাদের সম্মান অটুট রাখার ব্যবস্থা তৈরি হলো।
পাঁচ
একদিন গ্রামের চৌরাস্তার মোড়ে সবাই মিলে একটি সভা বসে।
মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম দাঁড়িয়ে বললেন—
“দেখুন, ভিক্ষাবৃত্তি দমন শুধু আইন দিয়ে হয় না। হয় ইমান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সমাজের দায়িত্ব—এই চার জিনিস দিয়ে।
আমরা চেষ্টা করেছি রাসূলুল্লাহ (স)-এর পথ অনুসরণ করতে—
একদিকে ভিক্ষা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা,
অন্যদিকে যারা বিপদে পড়েছে তাদের সহযোগিতা।
এখন গ্রামটিকে বদলাতে হলে আমাদের সবাইকে এই দায়িত্ব নিতে হবে।”
মানুষ হাত তুলে বলল—
“হুজুর, আমরা আপনার সঙ্গে আছি।”
ছয়
মাত্র ছয় মাসের ব্যবধান।
যে জামালপুরের কৈডোলা উত্তর পাড়া প্রায় প্রতিদিন ভিক্ষুক দেখা যেত, এখন সেখানে মানুষ কাজ খুঁজে বেড়ায়।
কেউ কাঠ কেটে বিক্রি করে, কেউ মাঠে কাজ করে, কেউ ছোট ব্যবসা শুরু করেছে।
অক্ষমদের জন্য গ্রামে একটি ছোট ‘সহায়তা কেন্দ্র’ তৈরি হয়েছে, যেখানে খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সবসময় পাওয়া যায়।
গ্রামে এখন একটি কথাই আলোচিত—
“ভিক্ষা নয়, কাজই মর্যাদার চিহ্ন।”
আর মানুষ বলতে শুরু করেছে—
“রাসূল (স)-এর শিক্ষা সমাজকে কীভাবে বদলে দিতে পারে, গোলাপপুর তার উদাহরণ।”
শেষ দৃশ্য
এক সন্ধ্যায় হতদরিদ্র বৃদ্ধ মজিবুর আলী হাঁটতে না পারায় মাওলানা সাহেব তার ঘরে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে পৌঁছে গেলেন।
বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
“হুজুর, আমি তো কারো কাছে হাত পাততে পারি না। আপনারা আমাকে যে সম্মান দিয়ে রাখছেন—এতো বড় নিয়ামত আল্লাহ আপনাদের দিক।”
মাওলানা সাহেব বললেন—
“চাচা, আপনাকে সাহায্য করা আমাদের ফরজ দায়িত্ব। অসহায়কে সাহায্য করাই তো ইসলামের সৌন্দর্য।”
গ্রামের পূর্ণিমার আলোয় দাঁড়িয়ে তিনি মনে মনে বললেন—
“যেখানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিক্ষা আছে, সেখানে মানবিকতার আলো কখনো নিভে না।”
✍️মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।
তারিখ:১৯/১১/২০২৫
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন