হাদীসের আলোকে নৈতিকতা ও আধুনিক সমাজ : দৃষ্টি, শ্রবণ, ভাষা ও চলাফেরার সতর্কতা ও পার্কে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা। রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 প্রভাষক: হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।

 হাদীসের আলোকে নৈতিকতা ও আধুনিক সমাজ : দৃষ্টি, শ্রবণ, ভাষা ও চলাফেরার সতর্কতা ও পার্কে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা।

পরান পুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।


মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সম্মানিত, কিন্তু তার অন্তরে স্থাপন করা হয়েছে নফস, প্রবৃত্তি ও পরীক্ষা। এই পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে “যেনা” বা অবৈধ আকাঙ্ক্ষার দিকে ঝোঁক, যা কেবল দেহগত পাপেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং মানবজীবনের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের একটি নৈতিক দায়িত্ব আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর উপরোক্ত হাদীসে সেই গভীর নৈতিক বাস্তবতাকেই তুলে ধরা হয়েছে।


হাদীসে বলা হয়েছে—

মানুষের প্রতিটি অঙ্গই যেনার কোনো না কোনো অংশের দিকে ধাবিত হতে পারে।

দৃষ্টি, শ্রবণ, মুখের কথা, হাত, পা, এমনকি অন্তরের আকাঙ্ক্ষাও পাপের দিকে মানুষকে টেনে নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত লজ্জাস্থানই নির্ধারণ করে যে মানুষ সেই পাপে পতিত হলো কি না। অর্থাৎ, শারীরিক পাপ না ঘটলেও অন্তরের আকর্ষণ ও বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভুল ব্যবহারও একটি নৈতিক অপরাধ, যা আত্মাকে কলুষিত করে।


এই হাদীস আধুনিক সমাজের নৈতিক সমস্যার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত যুগোপযোগী। বিশেষ করে নগরসভ্যতার এমন আবহে যেখানে পার্ক, সড়ক, ক্যাফে বা উন্মুক্ত পরিবেশে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে—সেখানে হাদীসটি যেন আমাদের সামনে এক অনিবার্য সতর্কবার্তা হয়ে আসে।


১. চোখের যেনা : অশালীন দৃষ্টি ও আধুনিক বিনোদনের প্রভাব

রাসূল ﷺ বলেছেন, “চোখের যেনা হলো দেখা।”


বর্তমান সমাজে এই চোখের যেনা সবচেয়ে দ্রুত ও সহজে সংঘটিত হয়।

পার্ক, শপিংমল, বিশ্ববিদ্যালয় বা উন্মুক্ত ক্যাফেগুলোতে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা সাধারণ দৃশ্য। তারা একসঙ্গে বসছে, হাঁটছে, ছবি তুলছে বা ঘনিষ্ঠভাবে সময় কাটাচ্ছে—ফলে আশেপাশের মানুষের দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়। অন্যদিকে মোবাইল ফোনে অসংখ্য অনৈতিক কনটেন্ট, সিনেমা ও সোশ্যাল মিডিয়ার চিত্র মানুষের দৃষ্টিকে ক্রমাগত উত্তেজিত করছে।


আল্লাহ তাআলা বলেছেন—

“মুমিন পুরুষদের বলো—তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।” (সূরা নূর : ৩০)

সুতরাং দৃষ্টি সংযত রাখা আধুনিক যুগে আরও কঠিন হলেও আরও জরুরি।


২. কানের যেনা : অশালীন কথা, গান ও আড্ডার প্রভাব


✓হাদীসে বলা হয়েছে—

“কানের যেনা শুনা।”


আজকের সমাজে গান, অশ্লীল কৌতুক, রোমান্টিক কথোপকথন অথবা অনৈতিক আলাপচারিতা শুনে মানুষ নৈতিকতার সীমানা হারাতে বসেছে। পার্কে বসে অনেক তরুণ-তরুণী ঘণ্টার পর ঘণ্টা গভীর ব্যক্তিগত ও অশোভন আলাপ করে—এতে শুধু তারা নিজেরাই নয়, আশেপাশের মানুষও অস্বস্তি বোধ করে, এবং সমাজের নৈতিক পরিবেশ নষ্ট হয়।


কুরআনে আল্লাহ বলেন—

“অশ্লীলতা ও পাপাচারণের কাছেও যেয়ো না।” (সূরা আনআম : ১৫১)

যার অর্থ—শোনা, দেখা, বলা—পাপের যেকোনো উপকরণই পরিহার করা ফরজ।


৩. জিহ্বার যেনা : প্রেমালাপ, অশোভন কথা ও প্রতারণার দাহ

✓হাদীসে আরও বলা হয়েছে—

“জিহ্বার যেনা কথা বলা।”


আজকের তরুণ প্রজন্ম একে প্রায় স্বাভাবিক বিষয় মনে করছে।

প্রেমালাপ, মিষ্টি কথা, প্রতিশ্রুতি—এসবের মাধ্যমে অনেকে অপরজনকে মানসিকভাবে জড়িয়ে ফেলে। অথচ এগুলোর অধিকাংশই বিবাহের লক্ষ্য ছাড়াই ঘটে থাকে। পার্কে বসে দীর্ঘ সময় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতা, ফিসফিসিয়ে কথা বলা, পরস্পরকে আকৃষ্ট করার চেষ্টায় নানা অশোভন বাক্য—সবই জিহ্বার যেনার অন্তর্ভুক্ত।


৪. হাত ও পায়ের যেনা : স্পর্শ ও পাপের দিকে এগিয়ে যাওয়া


রাসূল ﷺ বলেছেন—

“হাতের যেনা স্পর্শ করা, পায়ের যেনা যেনার পথে চলা।”


আজ পার্কগুলোতে হাত ধরাধরি, আলিঙ্গন, ছবি তোলা—এসব আচরণ অত্যন্ত দ্রুতস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহপূর্ব শারীরিক স্পর্শ মারাত্মক গোনাহ। পা দিয়ে তারা সেই স্থানে যায়, যেখানে পাপের সম্ভাবনা প্রবল—এটিও হাদীস অনুযায়ী যেনারই একটি স্তর।


৫. অন্তরের যেনা : কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা ও নৈতিক পতন


সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা।

হাদীসে বলা হয়েছে—

“অন্তর কামনা করে ও আশা করে।”


পার্কে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, জীবনের বহু পরিসরে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা এই আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করে। চোখ দেখে, কান শোনে, জিহ্বা কথা বলে—শেষ পর্যন্ত হৃদয় সেই অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। মানুষ বাহ্যিক পাপে না পড়লেও অন্তর কলুষিত হয়— যা ঈমানের উপর গভীর প্রভাব রেখে যায়।


৬. সমাজে অবাধ মেলামেশার ক্ষতিকর প্রভাব


১. নৈতিকতা ধ্বংস হয়

২. পরিবার ব্যবস্থা দুর্বল হয়

৩. বিবাহের গুরুত্ব কমে যায়

৪. অশান্তি, অবিশ্বাস ও প্রতারণা বাড়ে

৫. সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পায়


ইসলাম মানুষের স্বাধীনতা কাড়ে না; বরং তাকে নিরাপত্তা দেয়, মর্যাদা রক্ষা করে এবং সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।


৭. ইসলামের সমাধান : পবিত্রতা, সংযম ও বৈধ সম্পর্ক


১. দৃষ্টি সংযত রাখা

২. পারস্পরিক হায়া বজায় রাখা

৩. অপ্রয়োজনীয় মিশ্র আড্ডা বন্ধ করা

৪. বিবাহকে সহজ করা

৫. বিনোদন ও সময় কাটানোর হালাল বিকল্প তৈরি করা

তাই বলা যায় যারা অশ্লীল কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে তাদের জন্য নাজাতের উসিলা হয়ে যায়। সফলতা অর্জন করে।

“যারা (অশ্লীলতা) থেকে দূরে থাকে, তাদের জন্য রয়েছে মহান পুরস্কার।”( আল কোরআন)

সূরা মুমিনুন(৫-৭) দেখার অনুরোধ রইল।

উপসংহার


এই হাদীস শুধু একটি নিষেধাজ্ঞা নয়—বরং মানুষের নৈতিক চরিত্রকে সুরক্ষিত রাখার সর্বোচ্চ নির্দেশনা। আধুনিক সমাজে অবাধ মেলামেশা যত বাড়ছে, ততই এই হাদীসের শিক্ষা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো—নিজেকে, পরিবারকে ও সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচানো।


পরিশেষে স্মরণীয় কথা—

পাপ কখনো হঠাৎ করে আসে না; শুরু হয় চোখ, কান, কথা, স্পর্শ ও আকাঙ্ক্ষার ছোট ছোট ভুল থেকে।

তাই রাসূল ﷺ–এর সতর্কবার্তা আমাদের জন্য নৈতিক জীবনযাপনের পথে সর্বোত্তম পথনির্দেশ।


রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 

প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।

তারিখ:২৫/১১/২০২৫

Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ