ছোট গল্প:মাতৃভাষার মর্মবাণী, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:২৭/১১/২০২৫

 ছোট গল্প:মাতৃভাষার মর্মবাণী


বাংলার এক নামকরা অঞ্চলে বসবাস করতেন জমিদার নছিরউদ্দিন সাহেব। জমিদার হলেও ছিলেন দয়ালু, ধর্মভীরু এবং মানুষের প্রতি মমত্ববোধে পরিপূর্ণ। তাঁর পরিবারটিও ছিল শিক্ষিত, মার্জিত, এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়া। তাঁর একমাত্র ছেলে—রাশেদ—ছিল পরিবারের স্নেহের কেন্দ্রবিন্দু। জমিদার ও তাঁর স্ত্রী দু’জনেই রাশেদের প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন।


মা ছিলেন খাঁটি বাংলার নারী। জীবনে কখনো বিদেশ যাননি, আধুনিক শিক্ষার ধারেকাছেও যাননি; তবুও তাঁর বুদ্ধি, মূল্যবোধ এবং দয়ার পরিমাণ কোনও দিক থেকেই কম ছিল না। বাবা–মা চেয়েছিলেন একমাত্র সন্তানকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষিত করতে, যাতে সে ভবিষ্যতে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারে।


🌺বিদেশে পড়ার সিদ্ধান্ত


রাশেদ ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। বড় হওয়ার সাথে সাথে তার মধ্যে বিদেশে পড়ার আকাঙ্খা জন্ম নেয়। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করে আন্তর্জাতিক পরিসরে বড় কিছু করার স্বপ্ন বুকে লালন করতে থাকল।


বাবা-মা প্রথমে দ্বিধায় পড়লেও শেষ পর্যন্ত ছেলের ইচ্ছাকে সম্মান করলেন। জমিদার সমাজে মান রাখতে চান, আবার ছেলের ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল হোক—এই দুই আকাঙ্ক্ষা তাদের বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করল।


মা চোখের পানি মুছে বলেছিলেন,

— “বাবা, তুমি বিদেশে যাবে ঠিকই, কিন্তু নিজের ভাষা, ধর্ম আর সংস্কৃতি যেন কখনো ভুলে যাস না।”


রাশেদ মুচকি হেসে বলেছিল,

— “মা, সেসব তো হৃদয়ে লেখা। শেখার জন্য বিদেশ যাচ্ছি, বদলে যাওয়ার জন্য নয়।”


🌹বিদেশের জীবন ও ভাষার প্রতি আকর্ষণ


বিদেশে গিয়ে রাশেদ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ইংরেজি ভাষা শেখার প্রতি তার অসীম উৎসাহ তাকে দ্রুতই দক্ষতা এনে দিল। সে বিভিন্ন বিদেশি বন্ধুর সঙ্গে মিশতে লাগল, বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনায় নাম কামাল, এমনকি ইংরেজিতেই ভাবতে শুরু করল।


তিনি ধীরে ধীরে মাতৃভাষা বাংলা বলা কমিয়ে দিল। মা ভিডিও কলে কথা বললে বাংলায় কথা বলতে তার আর তেমন স্বাচ্ছন্দ্য লাগত না। অনেক সময় ইংরেজি শব্দের ভিড়ে মায়ের কথা বুঝতে তার সমস্যা হতো; তবুও মা হাসিমুখে বলতেন—

— “বাবা, ভাষা ভুলে গেলে তোমাকে বুঝতে কষ্ট হবে। আল্লাহ মানুষের মুখে ভাষা দিয়েছেন বুঝে-বুঝানোর জন্য।”


কিন্তু সে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দিল না। মনে করল, ভাষা শিখতেই তো গেছে, তাই ইংরেজিতেই কথা বলা উচিত।


💐ফিরে আসা ও অদ্ভুত পরিবর্তন


চার বছর বিদেশে থেকে অবশেষে দেশে ফিরে এল রাশেদ। বাবা-মায়ের আনন্দের সীমা ছিল না। তারা ভেবেছিলেন রাশেদ আরও পরিণত হয়েছে, বিনয়ী হয়েছে, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল হয়েছে।


কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। রাশেদ কথায় কথায় ইংরেজি বলছে। মা তাকে বারবার মনে করিয়ে দিতেন—

— “বাবা, এবার তো দেশে। আমাদের সঙ্গে বাংলায় কথা বললে আমরা ভালো বুঝতে পারি।”


কিন্তু রাশেদের কাছে এটি ছিল সেকেলে চিন্তা। সে ভাবত, ইংরেজির মাধ্যমে মানুষ আরও আধুনিক ও সম্মানিত হয়। তাই অভ্যাসবশত এবং অহঙ্কারের মিশেলে স্থায়ীভাবে সে ইংরেজিতেই কথা বলতে লাগল।


বাবা কখনও বুঝতে পারতেন, কখনও পারতেন না; আর মা তো প্রায়ই ছেলের কথার অর্থ বুঝতে ভুল করতেন।


🌺গুরুত্বপূর্ণ দিনটি


একদিন দুপুরে পরিবার সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছিল। মা নিজের হাতে রান্না করা খাবার সাজিয়ে দিয়েছিলেন। রাশেদ খেতে খেতে হঠাৎ গলায় খাবার আটকে গেল। শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল।


সে হাত তুলে মাকে পানির জন্য ইশারা করল এবং দ্রুত বলতে লাগল—

— “Water! Water! Please give me water!”


মা তো ইংরেজি বোঝেন না। তিনি মনে করলেন ছেলের হয়তো আরেকটু ভাত লাগবে বা খাবারটা পছন্দ হচ্ছে না। তিনি বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন—

— “কি চাই বাবা? আরেকটু ভাত দেব?”


কিন্তু এদিকে রাশেদের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে গেল। চিৎকার করার শক্তিও শেষ হয়ে আসছিল। সে বারবার “water” শব্দটি উচ্চারণ করতেই থাকল, আর মা বোঝার চেষ্টা করেও বুঝতে পারছিলেন না।


দুর্ভাগ্যক্রমে আশেপাশে তখন আর কেউ ছিল না। বাবা অন্য ঘরে অতিথিকে বিদায় দিচ্ছিলেন। মা অসহায় হয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, কী চাইছে সেটা বুঝতে না পেরে।


অল্প মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠল। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়ল রাশেদ। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে গেল।


👉বাবার উপলব্ধি


বাবা যখন ছেলের নিথর দেহ দেখে বুক চাপড়াতে লাগলেন, তখন তাঁর চোখ দিয়ে অঝোরে কান্না ঝরছিল। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন—


— “শখ করি বিদেশ পাঠাইলাম, বড় মানুষ বানানোর জন্য। কিন্তু সেই শখই আজ আমার বুক খালি করে দিল। ছেলের ভাষা শিখাইতে গেছিলাম, কিন্তু নিজের ভাষা ভুলায়ে ফেললাম। আর সেই ভুলেই আজ পুতরের জীবনটা হারাইলাম।”


এই কথাগুলো শুনে গ্রামের মানুষও মর্মাহত হলো। সবাই বলল—

“যে ভাষায় মা ডাকতে শেখায়, সে ভাষা ভুলে গেলে মানুষ তার অস্তিত্বই হারায়।”


🍌মায়ের কান্না ও অনন্ত আফসোস


মা নিথর সন্তানের মাথা কোলে নিয়ে কাঁদতে লাগলেন—

— “বাবা, তুমি যদি একবার বাংলায় ‘পানি’ বলতে, আমার মাথা খারাপ হলেও বুঝতাম। তোমাকে বাঁচাতে পারতাম। কেন তুমি আমাদের ভাষা ভুলে গেলে বাবা?”


তার কান্না যেন বাড়ির আকাশ-হাওয়াকে ভারী করে তুলল।


এ মৃত্যু কারও দোষে নয়—বরং ভুল মূল্যবোধের ফল। জমিদার ছেলে বিদেশে জ্ঞান শিখেছে ঠিকই, কিন্তু নিজের শিকড় ভুলে যাওয়াই তাকে মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।


💐নৈতিক শিক্ষা


দেশ-বিদেশে শিক্ষা লাভ করা খারাপ নয়। বরং ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে মহৎ কাজ হিসেবে দেখেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।”

(ইবনু মাজাহ)


কিন্তু ইসলাম একই সঙ্গে নিজের পরিবার, সংস্কৃতি, ভাষা ও শিকড়ের প্রতি সম্মান রাখতে শিখিয়েছে।


ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—ভাষা মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতি, অস্তিত্ব এবং সবচেয়ে বড় কথা—মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের সেতু।


যে মানুষ নিজের ভাষাই ভুলে বসে থাকে, সে যেন নিজের পরিচয়কে নিজেই মুছে দেয়। আর যে ব্যক্তি নিজের মায়ের ভাষা ভুলে যায়, সে বড় কোনো সংকটে পড়লে আর সাহায্য চাইতেই পারে না—কারণ তার চাওয়া কেউ বুঝবে না।


🌺শেষ কথা


রাশেদের মৃত্যুর পর জমিদার নছিরউদ্দিন সবার কাছে শিক্ষা হিসেবে বললেন—


“বিদেশি ভাষা শেখো, জ্ঞান অর্জন করো, দেশকে এগিয়ে নাও—এতেই উন্নতি। কিন্তু নিজের ভাষা, পরিবার আর শিকড় ভুলে যেও না। নইলে একদিন সেই ভুলই সবচেয়ে বড় আফসোস হয়ে ফিরে আসবে।”


এ গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি সকলের জন্য সতর্কতা।

শিক্ষা কখনো নিজের পরিচয় ভুলিয়ে দেওয়া নয়;

বরং শিক্ষা মানুষকে আরও বিনয়ী, সচেতন ও নিজ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে।

(আমার মায়ের মুখে শুনা গল্প সুন্দর ভাষায় রূপান্তর করা হয়েছে)


✍️শেষ কলমে,

🖋️মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম

প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।

তারিখ:২৫/১১/২০২৫

Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ