গল্প: ফরিদ উদ্দিন সাহেবের পাঁচ পু্ত্র ✍️মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ। তারিখ:১০/১১/২৩

গল্প: ফরিদ উদ্দিন সাহেবের পাঁচ পু্ত্র


✍️মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।
তারিখ:১০/১১/২৩

বাংলার এক শান্ত সুনিবিড় গ্রাম—সবুজ শস্যে ঘেরা, নদীর তীরে অবস্থিত। সেই গ্রামেই বাস করতেন এক খ্যাতিমান জমিদার ফরিদ উদ্দিন সাহেব। তাঁর ছিল বিশাল জমিদারি, বিস্তীর্ণ ক্ষেতখামার, বহু প্রজার আনাগোনা আর সমৃদ্ধ অর্থভাণ্ডার। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল তাঁর পাঁচ পুত্র।
বয়সে ছোট বড় হলেও, প্রত্যেকেই ছিল বুদ্ধিমান, উদ্যমী ও স্বপ্নবাজ।
বড় ছেলের নাম জসীমউদ্দীন, দ্বিতীয় সলিমউদ্দীন, তৃতীয় ইকবাল, চতুর্থ অনুপম হোসেন, আর ছোট ছেলের নাম ছিল সাদমান।

ফরিদ উদ্দিন ছিলেন প্রজ্ঞাবান এক মানুষ, ইসলামি আদর্শে জীবন পরিচালনা করতেন। তিনি সবসময় সন্তানদের বলতেন,
“ধনসম্পদ আল্লাহর নেয়ামত, কিন্তু এর সঠিক ব্যবহারই হচ্ছে প্রকৃত আমানতের খেয়াল রাখা।”

✓সন্তানদের আকাঙ্ক্ষা

একদিন বিকেলে, সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে, জমিদার বাড়ির বারান্দায় বসে চা পান করছিলেন ফরিদ উদ্দিন। হঠাৎ বড় ছেলে জসীমউদ্দীন এসে বলল—
“বাবা, আমি কাপড়ের ব্যবসা করতে চাই। আমাদের গ্রামে ভালো মানের কাপড়ের দোকান নেই। আমি শহর থেকে পাইকারি কাপড় এনে এখানে বিক্রি করব। এতে লাভ হবে, মানুষও উপকৃত হবে। কিন্তু ব্যবসা শুরু করতে কিছু পুঁজির প্রয়োজন।”

ফরিদ উদ্দিন একটু হেসে বললেন—
“ভালো কথা, ছেলে। ব্যবসা হালাল কাজ, যদি সততার সঙ্গে করা যায়।”

এরপর দ্বিতীয় ছেলে সলিমউদ্দীন এসে বলল—
“বাবা, আমি চিকিৎসা বিষয়ে পড়েছি। আমি একটা ছোট ফার্মেসি খুলতে চাই। ওষুধ বিক্রির পাশাপাশি চিকিৎসা সেবা দিতে চাই। এজন্য কিছু অর্থ লাগবে।”

বাবা মাথা নাড়লেন, বললেন—
“চিকিৎসা মানবসেবা, এটি মহান কাজ। তবে ওষুধ বিক্রিতে যেন লোভ না থাকে।”

এরপর তৃতীয় ছেলে ইকবাল এসে বলল—
“বাবা, আমি কৃষির কাজে মন দিতে চাই। জমিতে উন্নত জাতের ফসল চাষ করব। আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করব, যাতে আমাদের গ্রামের লোকও উপকৃত হয়।”

ফরিদ উদ্দিন আনন্দে বললেন—
“চমৎকার! কৃষি আল্লাহর অন্যতম বরকতময় পেশা। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

> ‘যে ব্যক্তি জমি চাষ করে, আর মানুষ, পাখি বা পশু তার ফসল থেকে খায়, তা তার জন্য সদকার সমান।’ (সহিহ বুখারী -২৩২০)

এরপর চতুর্থ ছেলে অনুপম হোসেন এসে বলল—
“বাবা, আমিও চাষাবাদ করতে চাই, তবে আমি ফল ও শাকসবজি উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেব। যাতে আমরা নিজেরাই পুষ্টিকর খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি।”

ফরিদ উদ্দিন তার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“ভালো কথা, অনুপম। খাদ্য উৎপাদন আল্লাহর রহমত অর্জনের একটি পথ।”

সবশেষে ছোট ছেলে সাদমান এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
বাবা বললেন—
“তুমি কী করতে চাও, সাদমান?”

সাদমান নিচু স্বরে বলল—
“বাবা, আমি এখনই কিছু করতে চাই না। আমি শুধু আপনাকে সহায়তা করতে চাই। আপনার কাছ থেকে শিক্ষা নিতে চাই—কীভাবে অর্থ ব্যয় করতে হয়, কীভাবে সঞ্চয় করতে হয়, কীভাবে অন্যের প্রয়োজন বোঝা যায়।”

বাবা মুচকি হেসে বললেন—
“তুমি সবচেয়ে বড় শিক্ষা গ্রহণের পথে আছো, সাদমান।”

✓ফরিদ উদ্দিনের উপদেশ

সবাইকে ডেকে ফরিদ উদ্দিন বললেন—
“আমার প্রিয় সন্তানরা! আমি তোমাদের প্রত্যেককে তোমাদের প্রয়োজন ও দক্ষতা অনুযায়ী অর্থ দেব। কিন্তু একটা শর্ত আছে—

> তোমরা কেউ যেন তোমাদের সমস্ত অর্থ একবারে খরচ না করে ফেলো।
সবসময় কিছু অর্থ সঞ্চয় করে রাখবে, যাতে বিপদের দিনে কাজে লাগে।”
তিনি একটু থেমে বললেন—
“রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“পাঁচটি জিনিসের আগে পাঁচটি জিনিসের সুযোগ গ্রহণ কর—
✓তোমার যৌবন বার্ধক্যের আগে,
✓তোমার সুস্থতা অসুস্থতার আগে,
✓তোমার সম্পদ দারিদ্র্যের আগে,
✓তোমার অবসর ব্যস্ততার আগে,
✓এবং তোমার জীবন মৃত্যুর আগে।”
> ‘জামে তিরমিযী -
তিনি আরও বললেন—২৪১৬
“আমাদের জীবন কখনোই সমান থাকে না। আজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে। তাই আয় করলে সঞ্চয় করবে, আর সঞ্চয়ের মধ্য থেকে কিছু আল্লাহর পথে দান করবে। এতে বরকত বাড়বে।”
ছেলেরা সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

ব্যবসার সূচনা

কিছুদিন পর ফরিদ উদ্দিন নিজের বাজেট ঠিক করলেন। বড় ছেলে জসীমউদ্দীনকে দিলেন ৫০,০০০ টাকা, দ্বিতীয় ছেলে সলিমউদ্দীন পেল ৭০,০০০ টাকা, ইকবাল পেল ৬০,০০০ টাকা, অনুপম পেল ৪০,০০০ টাকা, আর ছোট ছেলে সাদমানকে দিলেন সামান্য কিছু খরচের টাকা এবং দায়িত্ব দিলেন ঘরের হিসাব রাখার।

সবাই নিজের নিজের কাজে নেমে গেল।
জসীমউদ্দীন শহর থেকে কাপড় এনে দোকান খুলল, নাম দিল “আল-আমিন কাপড়ঘর”।
সলিমউদ্দীন ফার্মেসি চালু করল, নাম রাখল “শিফা মেডিকেল”।
ইকবাল মাঠে নেমে নতুন জাতের ধান চাষ শুরু করল।
অনুপম লাগাল সবজি আর ফলের বাগান।

প্রথম কয়েক মাসেই সবাই বেশ লাভ পেল। বাড়ির সবাই খুশি। ফরিদ উদ্দিন প্রতিদিন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।

✓পরীক্ষার সময়

কিন্তু জীবন সবসময় একরকম চলে না।
এক বছর পর, এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিল। নদীর পানি উপচে গ্রাম ভাসিয়ে দিল।
ইকবালের ক্ষেত নষ্ট, অনুপমের বাগান ধ্বংস।
গ্রামের অনেক মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেল।

জসীমউদ্দীনের ব্যবসাও থমকে গেল, কারণ কেউ আর কাপড় কিনতে আসছিল না।
শুধু সলিমউদ্দীনের ফার্মেসি তখনও খোলা ছিল—কারণ বন্যার সময় মানুষ ওষুধের জন্য ছুটছিল।

সবাই এসে বাবার কাছে গেল, চোখে উদ্বেগ।
“বাবা, এখন আমরা কী করব?”

ফরিদ উদ্দিন শান্তভাবে বললেন—
“তোমরা কি আমার উপদেশ মনে রেখেছ? আমি বলেছিলাম, সংকটের জন্য কিছু সঞ্চয় রাখবে।”

তখন সাদমান ঘরে গিয়ে হিসাবের খাতা এনে বাবাকে দেখাল।
সে নিয়মিতভাবে প্রত্যেক ভাইয়ের আয়-ব্যয় নথিভুক্ত করেছিল।
দেখা গেল, জসীমউদ্দীন ও ইকবাল কিছু সঞ্চয় রেখেছে, কিন্তু অনুপম প্রায় সব অর্থ খরচ করে ফেলেছে।

ফরিদ উদ্দিন বললেন—
“দেখো, এটাই হলো প্রস্তুতির প্রয়োজন। যদি আমরা সঞ্চয় না রাখি, সংকটে পড়লে অন্যের দ্বারে যেতে হয়।”

✓সংকটে সহযোগিতা

বাবার পরামর্শে সবাই একত্র হলো।
সলিমউদ্দীন তার ফার্মেসির আয় থেকে কিছু অর্থ দিল, জসীমউদ্দীন তার সঞ্চয় থেকে অংশ দিল, আর ইকবাল তার বীজ ও খাদ্য মজুত থেকে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বিতরণ করল।
অনুপম অনুতপ্ত হলো, বলল—
“বাবা, আমি বুঝতে পারিনি আপনার কথার গভীরতা। এখন বুঝছি, সঞ্চয় শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও জরুরি।”

বাবা হেসে বললেন—
“আলহামদুলিল্লাহ, তুমি শিক্ষা পেয়েছো, এটাই বড় কথা।”

গ্রামজুড়ে যখন দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা, তখন ফরিদ উদ্দিনের পরিবার হয়ে উঠল উদাহরণ।
তারা নিজেদের খাদ্য, ওষুধ, অর্থ ভাগাভাগি করে মানুষের পাশে দাঁড়াল।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

> “মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে অন্যদের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।” (সহিহ বুখারি)
এই হাদিসটি যেন বাস্তব রূপ পেল তাদের জীবনে।

✓আবার নতুন সূচনা

বন্যার পানি নামার পর সবাই আবার কাজে নেমে পড়ল।
ইকবাল নতুন করে ফসল রোপণ করল, এবার আরও উন্নত পদ্ধতিতে।
অনুপম বাগান নতুন করে সাজাল, আর বলল—
“এইবার আমি সঞ্চয় করব, বাবার উপদেশ মেনে।”

জসীমউদ্দীন দোকানে নামাজের জন্য আলাদা জায়গা রাখল এবং দোকানের আয় থেকে প্রতি শুক্রবার কিছু টাকা গরিবদের দান করল।
সলিমউদ্দীন তার ফার্মেসিতে বিনা পয়সায় গরিব রোগীদের ওষুধ দিতে শুরু করল।

ফরিদ উদ্দিন খুশি হলেন। তিনি বললেন—
“আলহামদুলিল্লাহ, তোমরা সবাই এখন শুধু ব্যবসায়ী নও, তোমরা এখন উপকারী মানুষ।”

✓শেষ পরিণতি ও শিক্ষা

কয়েক বছর পর গ্রামটি আবার সমৃদ্ধ হলো।
লোকেরা বলত—
“এই গ্রামে যদি কারও বিপদ আসে, ফরিদ উদ্দিন সাহেবের পরিবার প্রথমে এগিয়ে আসে।”

ফরিদ উদ্দিন বৃদ্ধ হলেন, কিন্তু তাঁর চোখে তৃপ্তির ছাপ।
তিনি সন্তানদের ডেকে শেষবারের মতো বললেন—

> “সন্তানরা, মনে রেখো—
অর্থ উপার্জন করা সহজ, কিন্তু সেটাকে হালালভাবে রক্ষা করা কঠিন।
আর সঞ্চয় শুধু নিজের বিলাসের জন্য নয়, সমাজের কল্যাণের জন্যও প্রয়োজন।
ইসলাম আমাদের শেখায়—আত্মনির্ভরতা, সততা ও দায়িত্ববোধ।”
সেদিন সন্ধ্যায় আকাশে লাল সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। ফরিদ উদ্দিন তাকিয়ে রইলেন সেই আকাশের দিকে। মুখে তৃপ্তির হাসি। তাঁর পুত্ররা এখন স্বাবলম্বী, নীতিবান ও সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত।

✓নৈতিক শিক্ষা:

✓ সঞ্চয় শুধু সম্পদ নয়, এটি দূরদর্শিতার প্রতীক।
✓ ইসলাম আমাদের শেখায়, সুস্থ অবস্থায় অসুস্থতার পূর্বে প্রস্তুতি নিতে।
✓ ধন-সম্পদ আল্লাহর আমানত, তাই তার সঠিক ব্যবহারই প্রকৃত দীনদারি।
✓ সমাজের কল্যাণে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করলে আল্লাহ বরকত দান করেন।
✓ দুঃসময়ে একে অপরকে সাহায্য করাই প্রকৃত মুসলমানের পরিচয়।

Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ