গল্পের নাম: “দেশি মুরগি না খাওয়া শিক্ষক”, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:১১/১১/২০২৫

গল্পের নাম: “দেশি মুরগি না খাওয়া শিক্ষক”


টাংগাইল জেলার এক শান্ত, সুন্দর গ্রাম—বটতলা। চারদিকে সবুজের সমারোহ, বয়ে চলা খাল, বাঁশঝাড়ের ফাঁকে পাখির কিচিরমিচির। গ্রামটা ছোট হলেও মানুষগুলো পরিশ্রমী, অতিথিপরায়ণ আর আন্তরিক। এখানেই আছে একটা পুরনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—“বটতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।”

বিদ্যালয়টা গ্রামের প্রাণ। সকালে আজান শেষ না হতেই স্কুলের পাশে পুকুরঘাটে ছেলেমেয়েরা মুখ ধুয়ে আসে, হাতে খাতা-কলম নিয়ে। কেউ কেউ এখনো হাঁটতে হাঁটতে মুখস্থ করে—“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।” গ্রামের মাঠের ওপারে দেখা যায়—সবুজ ধানক্ষেতের মাঝখানে এক শিক্ষক সাইকেলে করে ধীরে ধীরে স্কুলের পথে আসছেন। তিনি আব্দুল হাকিম স্যার।

হাকিম স্যার এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে হাসি, কথায় মাধুর্য। গ্রামের লোকেরা তাঁকে শুধু শিক্ষক নয়, “হাকিম ভাই” বলেই ডাকে। তিনি গ্রামের লোকের বিয়ের সময় সালিশ করেন, অসুস্থের খোঁজ নেন, কারো ছেলে-মেয়ে পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকলে বাড়ি গিয়ে বোঝান।

গ্রামের মানুষ তাঁকে খুব ভালোবাসে। কারণ তিনি শুধু শিক্ষক নন—একজন মানুষ, যিনি সত্যিকার অর্থে সমাজের শিক্ষক।

কিন্তু একদিন বিকেলে তিনি চায়ের দোকানে বসে টেলিভিশনের সংবাদ দেখছিলেন। খবরের পর্দায় দেখা গেল—একজন শিক্ষক চোখের পানি ফেলছেন, বলছেন,

> “আমি বিশ বছর ধরে একটা দেশি মুরগি খেতে পারিনি!”

এ কথা শুনে দোকানের সবাই অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। কেউ বলল,
—“আরে! শিক্ষক হয়ে এমন কষ্ট?”
আরেকজন বলল,
—“তাইলে আমরা কী খাই ভাই? আমরা তো দিনমজুর, তার পরেও সপ্তাহে একদিন দেশি ডিম ভাজি খাই!”

হাকিম স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন,
—“সব শিক্ষক এক রকম নন ভাই। কেউ কেউ সত্যি কষ্টে আছেন, কেউ আবার কষ্টের গল্প বানিয়ে প্রচার চান। কিন্তু সত্য-মিথ্যা গুলিয়ে ফেললে মানুষ শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবে।”

চায়ের দোকানে সবাই নীরব হয়ে গেল। এরপর হাকিম স্যার ঘরে ফিরে এলেন। সন্ধ্যায় উঠোনে হাঁটছিলেন। আশপাশে গাছের পাতায় হালকা হাওয়া, দূরে পুকুরে ব্যাঙ ডাকছে। ঘরে ঢুকে দেখলেন—স্ত্রী রান্না করছেন, হাঁড়িতে ফুটছে দেশি মুরগির ঝোল।

তিনি হেসে বললেন,
—“দেখো তো, আজ খবরের পর সবাই বলবে—গ্রামের শিক্ষকরা নাকি মুরগি খেতে পারে না, কিন্তু আমরা তো নিজের পোষা মুরগিই খাচ্ছি!”

স্ত্রী হেসে বলল,
—“এই গ্রামে কোন শিক্ষক আছে যে মাছ-মাংস খায় না? সবাই নিজে পালন করে, কেউ গরু দোহায়, কেউ হাঁস-মুরগি পালন করে। এইটাই তো গ্রামের সৌন্দর্য!”

রাতের খাবারের পর হাকিম স্যার লিখতে বসলেন তাঁর ডায়েরিতে—

> “আজকাল শিক্ষক সমাজের কিছু সদস্য নিজেদের দুর্দশা এমনভাবে দেখায়, যেন শিক্ষক মানেই ভিখারি। অথচ সত্য হলো, গ্রামীণ শিক্ষকরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে সুখী মানুষ। তাদের ঘরে হাসি, বাগানে ফল, পুকুরে মাছ, উঠোনে মুরগি। তাদের কষ্ট আছে, কিন্তু সেই কষ্টে আছে তৃপ্তি—সততার তৃপ্তি।”

পরের দিন সকালে হাকিম স্যার স্কুলে গেলেন। ছেলেমেয়েরা তাঁকে দেখে দৌড়ে এল—
—“স্যার, আজ আমরা কবিতা শিখব?”
—“হ্যাঁ, আজ তোমরা শেখো, ‘সততাই সেরা গুণ।’”

তিনি বোর্ডে বড় করে লিখলেন: “সত্য বলাই শিক্ষকতার প্রথম পাঠ।”

সেই দিন থেকেই গ্রামের ছেলেমেয়েরা শুধু বইয়ের অঙ্ক বা বানান শিখল না, শিখল—মিথ্যা কথা মানুষকে ছোট করে, আর সত্য মানুষকে বড় করে তোলে।

বটতলা গ্রামের বাতাসে তখনো বইছে গন্ধ—দেশি মুরগির ঝোলের, খাঁটি দুধের, আর সততার।

শেষে গ্রামের মানুষ বলে উঠল—
“যে শিক্ষক সত্যের শিক্ষা দেয়, সে-ই আসল শিক্ষক।”



🖋️ রচনায়:মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
🌺প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা,
নওগাঁ।
💐ভূতপূর্ব: আরবি প্রভাষক বলদীআটা ফাজিল মাদ্রাসা,ধনবাড়ী, টাঙ্গাইল।
তারিখ:১১/১১/২০২৫
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ