হিজড়া জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: ভিক্ষাবৃত্তি ও চাঁদাবাজি বন্ধে করণীয় এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি। রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:১১/১০/২০২৩

হিজড়া জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: ভিক্ষাবৃত্তি ও চাঁদাবাজি বন্ধে করণীয় এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি।



প্রস্তাবনা

মানবজাতির প্রতিটি ব্যক্তিই আল্লাহর সৃষ্টি। সৃষ্টির বৈচিত্র্য আল্লাহ তায়ালার কুদরতের নিদর্শন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—

"وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ"
অর্থাৎ, “আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা প্রদান করেছি” (সূরা আল-ইসরা: ৭০)।

এই মর্যাদা লিঙ্গ, রূপ, শক্তি বা শারীরিক প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে না; বরং মানুষ হওয়ার কারণেই মর্যাদা প্রাপ্য। সমাজের খুনছা বা হিজড়া জনগোষ্ঠীও একই মানব মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নানা সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, আর্থিক বঞ্চনা ও শিক্ষাবঞ্চনার কারণে তারা স্বাভাবিক জীবন থেকে বহু দূরে সরে যায়।

ইসলাম তাদের প্রতি দয়া, সহমর্মিতা, ন্যায় ও মানবিক আচরণ প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। একইসাথে জীবিকা অর্জনে হালাল উপায় অবলম্বন বাধ্যতামূলক করেছে। তাই তাদের ভিক্ষাবৃত্তি বা চাঁদাবাজির মতো আচরণ থেকে মুক্ত করে কর্মসংস্থানের পথ দেখানো শুধু মানবিক দায় নয়; বরং ইসলামি নৈতিকতারই দাবি।

✓হিজড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থান: একটি বাস্তব চিত্র

বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা-নির্যাতনের শিকার। তারা সমাজে অসহায়, উপহাস-নিন্দার পাত্র এবং অনেকের কাছে অশুভ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এই ভুল ধারণাগুলো তাদের মানবিক অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
যেসব কারণে তারা সমস্যার মুখে পড়ে:

১. পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা

অনেক পরিবার লজ্জা, কুসংস্কার বা আতঙ্কের কারণে তাদের সন্তানকে গ্রহণ করতে চায় না। এটি ইসলামবিরোধী, কারণ সন্তান আল্লাহর দান— সে যেমনই হোক।

২. শিক্ষাবঞ্চনা

পরিবার ছাড়ার ফলে তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ হারায়। শিক্ষাহীনতা তাদের কর্মজীবনে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করে।

৩. কর্মসংস্থানের অভাব

সমাজ তাদের কর্মক্ষেত্রে গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করে। ফলে তারা স্বাভাবিক অর্থনৈতিক জীবনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

৪. বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি ও চাঁদাবাজির পথে প্রবেশ

কাজ না পেলে মানুষ উপার্জনের অন্য পথ খোঁজে। তাদের ক্ষেত্রে এ পথটি প্রায়শই ভিক্ষাবৃত্তি বা জোরপূর্বক টাকা আদায়ে গিয়ে থামে।

৫. মানসিক আঘাত

অপমান, উপহাস, তিরস্কার— এগুলো তাদের মনোবলকে দুর্বল করে।

এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণে ইসলামি নৈতিকতাভিত্তিক সমাধানই হতে পারে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পথ।

ইসলামি দৃষ্টিকোণ: আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি সম্মান

ইসলাম সব মানুষের প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ দেয়। হিজড়া বা ‘মুখান্নাস’— এ জাতীয় মানুষ রাসুলুল্লাহ (স.)–এর যুগেও ছিল, এবং তিনি তাদের অধিকার রক্ষা করেছেন।

১. সৃষ্টির বৈচিত্র্য আল্লাহর ইচ্ছা

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

“لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ”
(সূরা আশ-শূরা: ৪৯)
অর্থাৎ আল্লাহ যাকে যেভাবে সৃষ্টি করতে চান, তাঁর পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে।
অতএব হিজড়া বা খুনছা কোনো অভিশাপ নয়— এটি আল্লাহর সৃষ্ট বৈচিত্র্যের অংশ।

২. প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতি দয়া করা ফরজ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“যে ব্যক্তি পৃথিবীর জীবের প্রতি দয়া করে, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন।”
আল হাদিস

যেহেতু হিজড়া সম্প্রদায় সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠী, তাই তাদের প্রতি দয়া, ভরণপোষণ ও সহায়তা করা মুসলিম সমাজের দায়িত্ব।

৩. ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ, তবে অভাবীদের সাহায্য করা বড় সওয়াব

হাদিসে আছে—
“উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।”
(আল হাদিস)

✓অর্থাৎ কর্মে নিয়োজিত হাত ভিক্ষার হাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
✓সুতরাং হিজড়া জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম করে তোলা ধর্মীয় দায়িত্ব।
✓ভিক্ষাবৃত্তি ও চাঁদাবাজি বন্ধে ইসলামি নীতিভিত্তিক করণীয়
✓এ সমস্যা সমাধানে ইসলামি নীতির আলোকে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি—

১. ন্যায় প্রতিষ্ঠা: হিজড়াদের উপর জুলুম বন্ধ করা

✓ইসলাম অন্যায় ও জুলুম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
সন্তানকে ত্যাগ করা, উপহাস করা, সমাজচ্যুত করা— ইসলামী দৃষ্টিতে জুলুম।

✓পরিবারগুলোকে শেখানো প্রয়োজন যে:
✓সন্তানকে লজ্জার নয়, আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখা— এটি ঈমানের দাবি
✓জন্মগত ভিন্নতা কারো দোষ নয়


২. সমাজের দায়িত্ব: কর্মসংস্থান সৃষ্টি
ইসলাম কাজ করা ও হালাল রোজগারকে ইবাদত বলে ঘোষণা করেছে।
হিজড়াদের জন্য—

✓সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে বিশেষ কোটা
✓ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ
✓সুদবিহীন সহায়তা কর্জে হাসানা ফান্ড গঠন।
✓সামাজিক ব্যবসায় যুক্ত করার সুযোগ
✓তৈরি করা জরুরি।

৩. জোরপূর্বক টাকা আদায় বন্ধে আইনি ব্যবস্থা

ইসলাম জবরদখল, হুমকি-চাঁদাবাজি নিষিদ্ধ করেছে।
রাষ্ট্রকে—

✓চাঁদাবাজি বন্ধে নিয়মিত নজরদারি
✓ট্রাফিক সিগন্যালে ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ
✓রাস্তার নিরাপত্তা বৃদ্ধি
✓নিশ্চিত করতে হবে।
✓তবে শাস্তির পাশাপাশি পুনর্বাসনের দরজা খোলা রাখতে হবে— এটাই ইসলামের ভারসাম্য।

৪. দানের মাধ্যমে নয়— ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সহায়তা
ইসলামে শুধু দান নয়; মানুষকে স্বাবলম্বী করা অধিক সওয়াবের কাজ।
"যদি তুমি দরিদ্রকে এমন কিছু দাও, যার দ্বারা সে উপার্জন করতে পারে, তবে সেটি সর্বোত্তম সদকা।”
অতএব হিজড়াদের এমন দক্ষতা দিতে হবে যা তাদের জীবন বদলে দেবে।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি
তাদের জন্য যে প্রশিক্ষণগুলো সবচেয়ে কার্যকর—

১. কারিগরি প্রশিক্ষণ

✓দর্জি ও টেইলারিং
✓হ্যান্ডিক্রাফ্ট
✓মোবাইল-ইলেকট্রনিক্স সার্ভিস
✓রান্না-বান্না
✓বিউটি সার্ভিস
✓এই ক্ষেত্রগুলোতে তাদের আগ্রহ ও সক্ষমতা দুটোই বেশি।

২. আইটি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা

✓মৌলিক কম্পিউটার
✓ডাটা এন্ট্রি
✓গ্রাফিক্স ডিজাইন
✓ডিজিটাল মার্কেটিং
✓বর্তমান যুগে এসব দক্ষতা অমূল্য।

৩. স্বাস্থ্য ও সমাজসেবামূলক কাজে সম্পৃক্ততা
✓হিজড়া জনগোষ্ঠী স্থানীয় মানুষের সাথে সহজেই মিশে যেতে পারে। তাই—
✓টিকা কার্যক্রম
✓পরিবার পরিকল্পনা
✓স্বাস্থ্যসচেতনতা প্রচার
✓কমিউনিটি ভলান্টিয়ার
✓কাজে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

৪. ক্ষুদ্র ব্যবসায় উদ্যোগ
✓খাবারের দোকান
✓অনলাইন পণ্য বিক্রি
✓সেলুন/বিউটি পারলার
✓ফুল বা উপহার সামগ্রীর দোকান
✓এই ব্যবসাগুলো তাদের দ্রুত স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে।
✓সামাজিক মর্যাদা অর্জনে ইসলামি নির্দেশনা
✓ইসলাম মানব মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।
✓হিজড়া জনগোষ্ঠীর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য যা জরুরি—

১. সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা
✓কুরআনে বলা হয়েছে—
“কোন জাতি অন্য জাতিকে উপহাস করো না।”
(সূরা হুজুরাত: ১১)
✓হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তুচ্ছ করা, উপহাস করা বা অপমান করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।

২. গণমাধ্যমে সম্মানজনক উপস্থাপন
✓তাদেরকে রসিকতা, হাস্যরস বা নেতিবাচক চরিত্রে উপস্থাপন করা বন্ধ করতে হবে।
✓মিডিয়া ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে—
✓তারা সফল হলে সমাজ উপকৃত হবে
✓তারা সম্মান পেলে মানুষই বেশি নিরাপদ হবে

৩. ইসলামি নেতাদের ভূমিকা

✓ইমাম, আলেম ও দাঈরা খুতবায় ও আলোচনায়—
✓মানবাধিকার
✓দুর্বলদের প্রতি দয়া
✓ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধের নীতি
✓হালাল উপার্জনের গুরুত্ব
✓বিষয়ে বক্তব্য দিলে সমাজ দ্রুত বদলাবে।

৪. সামাজিক অন্তর্ভুক্তি

✓মসজিদে তাদের জন্য বক্তব্য, দোয়া ও পরামর্শ
✓এলাকাভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি
✓পাড়া-মহল্লার মানুষদের সচেতনতা
✓এসব উদ্যোগ তাদের মর্যাদা নিশ্চিত করবে।
✓একটি সমন্বিত ইসলামি সমাধান কাঠামো
হিজড়া জনগোষ্ঠীর সমস্যার টেকসই সমাধানে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ জরুরি—

১. পরিবারে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি
পরিবার ইসলামি শিক্ষার আলোকে দায়িত্ব গ্রহণ করলে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যায়।

২. শিক্ষা → প্রশিক্ষণ → কাজ → মর্যাদা

এই ক্রমেই তাদের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

৩. রাষ্ট্র, সমাজ ও আলেমদের যৌথ উদ্যোগ

✓ইসলামের দৃষ্টিতে সকলেই দায়িত্ববান—
✓রাষ্ট্র ন্যায় ও কর্মসংস্থান দেবে,
✓সমাজ সম্মান দেবে,
✓আলেমরা পথ দেখাবে,
✓আর হিজড়ারা পরিশ্রম করবে।

৪. মানবিক আচরণের বিস্তার
রাসুল (সা.) বলেছেন—
“তুমি তোমার ভাইয়ের জন্য যা ভালোবাসো, তোমার জন্যও তাই ভালোবাসো।”
(মেশকাত)
যে সমাজ এ নীতিতে চলে, সেখানে কোনো মানুষ অবহেলিত থাকে না।

উপসংহার

হিজড়া জনগোষ্ঠী আল্লাহর সৃষ্টি। তারা কোনো ভুল বা অপরাধের কারণ নয়; বরং সমাজের পরীক্ষার একটি অংশ। তাদের প্রতি অবহেলা করা, তুচ্ছ করা বা অধিকার বঞ্চিত করা ইসলামবিরোধী। তাদের কর্মক্ষম করা, তাদের ভিক্ষাবৃত্তি ও চাঁদাবাজি থেকে মুক্ত করা, প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করা— এগুলোর প্রতিটিই মানবতার পাশাপাশি মহান সওয়াবের কাজ।

✓ইসলামের আলোকে সমাজ যদি তাদের পাশে দাঁড়ায়—
✓তারা ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসবে
✓কর্মজীবনে যুক্ত হবে
✓তাদের সম্মান বৃদ্ধি পাবে
✓সমাজ আরও শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবিকতায় পরিপূর্ণ হবে
✓একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও দয়া-সমৃদ্ধ সমাজই প্রকৃত ইসলামি সমাজ।
✓হিজড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন সেই সমাজ গঠনের অন্যতম শর্ত।

রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।
তারিখ:১৫/১১/২০২৫
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ