ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা।
ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা।
ভূমিকা
ইসলাম একমাত্র ধর্ম যা নারীর সম্মান ও মর্যাদাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। জাহেলিয়াতের যুগে নারীরা ছিল অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও অধিকার বঞ্চিত। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, নারীদের শুধু ভোগের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এই অমানবিক ও বর্বর সমাজে ইসলাম প্রথম ঘোষণা করল—নারী একজন পূর্ণ মানুষ, সম্মানিত, অধিকারপ্রাপ্ত এবং আত্মমর্যাদার অধিকারী।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ
“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি।”
(সূরা আল-ইসরা: ৭০)
এই আয়াতে মানবজাতির সম্মানের ঘোষণা এসেছে, যেখানে নারী-পুরুষের পার্থক্য করা হয়নি।
নারীর অধিকার ও মর্যাদার ইতিহাস:
ইসলামের পূর্বে গ্রিক, রোমান, হিন্দু ও ইহুদি সভ্যতায় নারীরা ছিল অধিকার বঞ্চিত। বহু সভ্যতায় নারী ছিল পুরুষের সম্পত্তি, বিবাহ ছিল বিক্রয় চুক্তির মত, মা হবার মর্যাদা ছিল না, নারী ছিল শুধু সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র।
ইসলাম এসে নারীর মানবিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করল এবং স্পষ্ট করে দিল—পুরুষ ও নারী উভয়েই আল্লাহর সৃষ্টি, এবং উভয়েই তাঁর নিকট দায়িত্বশীল।
১. সৃষ্টিগত মর্যাদা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ
“হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক প্রাণ হতে সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা আন-নিসা: ১)
এই আয়াতে বোঝানো হয়েছে—নারী ও পুরুষ এক উৎস থেকেই সৃষ্টি। ফলে সৃষ্টি হিসেবে নারী কোনোভাবেই হীন নয়।
২. কন্যা সন্তান হিসেবে নারীর মর্যাদা:
ইসলাম কন্যা সন্তানকে লাঞ্ছনার প্রতীক নয়, বরং জান্নাত লাভের মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
مَن عالَ جاريتَينِ حتَّى تبلُغا، جاءَ يومَ القيامةِ أنا وهوَ كهاتينِ
“যে ব্যক্তি দুইটি কন্যা সন্তান প্রতিপালন করে তাদের যৌবনে পৌঁছে দেয়, কিয়ামতের দিন আমি এবং সে এভাবে পাশাপাশি থাকব (এবং তিনি তাঁর দুই আঙ্গুল একসাথে দেখালেন)।”
(সহীহ মুসলিম)
৩. মায়ের মর্যাদা:
ইসলামে মা'র মর্যাদা সর্বোচ্চ। জাহেলিয়াতে যাদের কোনো স্থান ছিল না, ইসলাম তাদের পায়ের নিচে জান্নাতের ঘোষণা দিল।
হাদীস:
الجَنَّةُ تَحْتَ أَقْدَامِ الأمَّهَاتِ
“জান্নাত মায়েদের পায়ের নিচে।”
(মুসনাদে আহমাদ)
আরেক হাদীসে নবীজি বলেন:
“তোমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে হকদার কে?”
তিনি তিনবার বললেন: “তোমার মা।”
(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
৪. স্ত্রীর মর্যাদা ও অধিকার:
ইসলামে স্ত্রীকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখা হয়েছে। তাকে ভরণ-পোষণের অধিকার, ভালো ব্যবহারের অধিকার এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকার দেয়া হয়েছে।
কুরআনে বলা হয়েছে:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে উত্তমভাবে জীবন যাপন করো।”
(সূরা আন-নিসা: ১৯)
রাসূল (সা.) বলেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ
“তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে নিজের স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ করে।”
(তিরমিযী)
৫. নারীর শিক্ষা অধিকার:
ইসলামে জ্ঞানার্জন শুধু পুরুষের জন্য নয়, নারীর জন্যও ফরজ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
“জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।”
(ইবনু মাজাহ)
নারীরা নবীজির দরসে অংশগ্রহণ করতেন, প্রশ্ন করতেন, এমনকি অনেক নারী ফিকহ ও হাদীসে প্রাজ্ঞ হয়েছিলেন। হজরত আয়েশা (রা.) ছিলেন সবচেয়ে বড় নারী মুহাদ্দিসা।
৬. নারীর অর্থনৈতিক অধিকার:
ইসলামে নারীরা সম্পত্তির মালিক হতে পারে, ব্যবসা করতে পারে, মেহের পায়, উত্তরাধিকার পায়।
আল্লাহ বলেন:
لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ
“পুরুষদের জন্য রয়েছে অংশ… এবং নারীদের জন্যও রয়েছে অংশ…”
(সূরা আন-নিসা: ৭)
খাদিজা (রা.) ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী। নবীজি তাঁর ব্যবসা পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।
৭. নিরাপত্তা ও পর্দার অধিকার:
ইসলাম নারীকে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করতে পর্দার বিধান দিয়েছে, যা তাদের মর্যাদা রক্ষা করে।
আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ
“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলুন—তারা যেন নিজেদের উপর চাদরের কিছু অংশ ঝুলিয়ে দেয়।”
(সূরা আল-আহযাব: ৫৯)
এটি কোনো কারাগার নয়, বরং একজন নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতীক।
৮. নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা:
ওমার (রা.) খোলাফায়ে রাশেদার যুগে নারীকে বাজার তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
উম্মে সালামা (রা.), আয়েশা (রা.) ইসলামী রাজনীতি, ফতোয়া, যুদ্ধপরামর্শ ইত্যাদিতে অংশ নিয়েছেন।নারীরা ওয়াজ-নসীহত, দাওয়াত, শিক্ষা-দীক্ষায় ভূমিকা পালন করেছেন।
৯. নারীর ইবাদতের সমান অধিকার:
ইসলাম নারীকে পুরুষের সমানভাবে ইবাদত করার সুযোগ দিয়েছে। কুরআন বলছে:
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ … أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“নিশ্চয়ই মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী… আল্লাহ তাদের জন্য মাগফিরাত ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।”
(সূরা আহযাব: ৩৫)
উপসংহার:
ইসলামে নারী মানেই দুর্বল, পরনির্ভরশীল নয়—বরং এক সম্মানিত, স্বাধীন ও অধিকারসমৃদ্ধ সত্তা। ইসলাম নারীকে দিয়েছে এমন মর্যাদা যা কোনো ধর্ম, মতবাদ বা সভ্যতা দেয়নি। আজকের সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে, ইসলামকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
শেষ কথা:
নারীর অধিকার রক্ষার নামে যারা ইসলামী সীমা অতিক্রম করে, তারা প্রকৃতপক্ষে নারীর মর্যাদা নয়, তাদের ইজ্জত ও আত্মিক শান্তি নষ্ট করছে। ইসলামই একমাত্র পথ যা নারীকে মর্যাদার সাথে বাঁচতে শেখায়।
রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন