✍️সাবালক হওয়া ও ব্যভিচারের শাস্তি ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:০৮/১১/২০২৫

 


✍️সাবালক হওয়া ও ব্যভিচারের শাস্তি

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে

১. ভূমিকা

ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি পর্যায়কে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে। একজন মানুষ কখন ধর্মীয় দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত হবে, তার কাজ কখন গুনাহ বা সওয়াবের যোগ্য হবে—তা নির্ভর করে “বালেগ” বা “সাবালক” হওয়ার উপর। অন্যদিকে, ইসলামী সমাজে নৈতিকতা ও পবিত্রতার অন্যতম রক্ষাকবচ হলো ব্যভিচার নিষিদ্ধকরণ। এই দুই বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এসেছে, যা মানবজীবনের নৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২. সাবালক হওয়ার মানদণ্ড ইসলামে

✓রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ
“তিন ব্যক্তির উপর কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ তাদের আমল লেখা হয় না):
(১) ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জেগে ওঠে;
(২) পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ হয়;
(৩) শিশুর উপর, যতক্ষণ না সে বালেগ হয়।”
(সহিহ হাদীস – বুখারী ও আবু দাউদ)

এই হাদীসের আলোকে ইসলামী শরীয়তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—একজন শিশুর উপর ধর্মীয় দায়িত্ব (সালাত, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি) তখনই ফরজ হবে, যখন সে বালেগ বা সাবালক হবে।

✓বালেগ হওয়ার লক্ষণসমূহ:

ইসলামী ফিকহ অনুসারে বালেগ হওয়ার কিছু নির্দিষ্ট চিহ্ন রয়েছে—
১. ছেলেদের ক্ষেত্রে:
✓স্বপ্নে বীর্যপাত হওয়া।
✓অথবা নাভির নিচে যৌনাঙ্গে চুল গজানো।
✓অথবা বয়স পূর্ণ হওয়া (১৪/১৫ বছর পূর্ণ হওয়া)।

২. মেয়েদের ক্ষেত্রে:
✓ঋতুস্রাব (মাসিক) শুরু হওয়া।
✓অথবা স্তনের বিকাশ এবং বয়সে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়া।
✓এই বিষয়ে হাদীস এসেছে:
✓ আত্বিয়্যাহ আল-কুরাযী (রহঃ) বলেন:
“বনু কুরাইযার বন্দীদের মাঝে আমি ছিলাম। তাঁরা (মুসলিমরা) নাভির নিচে চুল উঠেছে কি না তা পরীক্ষা করতেন। যার উঠেছে, তাকে প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হতো এবং হত্যা করা হতো; আর যার উঠেনি, তাকে হত্যা করা হতো না।”
(সহিহ হাদীস, আবু দাউদ, হাদীস ৪৩৯৯)
অর্থাৎ, নবী করিম ﷺ এর যুগেই বালেগ হওয়ার বাস্তব চিহ্ন হিসেবে শরীরিক পরিবর্তনকে বিবেচনা করা হতো।

✓ইসলামী শিক্ষার সারকথা:

অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশুর উপর কোনো অপরাধ বা পাপের দায় আরোপ হয় না। কারণ, সে তখনো বুদ্ধি ও দায়িত্ববোধে পরিপূর্ণ নয়। কিন্তু একবার বালেগ হলে, তার সমস্ত আমল লেখা শুরু হয়—ভালো কাজের জন্য সওয়াব ও মন্দ কাজের জন্য গুনাহ লিপিবদ্ধ হয়।

৩. ব্যভিচারের শাস্তি ইসলামে

ক. কুরআনের নির্দেশনা
✓আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।”
(সূরা আল-ইসরা: ৩২)
অর্থাৎ, ইসলাম শুধু ব্যভিচারকেই নিষিদ্ধ করেনি; বরং ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায় এমন প্রতিটি কাজ—দৃষ্টি, কথা, সম্পর্ক, নিভৃতে মেলামেশা—সবকিছুকেই নিষিদ্ধ করেছে।

খ. হাদীসে ব্যভিচারের বিচারিক দৃষ্টান্ত

✓আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা আসলাম গোত্রীয় এক লোক নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে নিজের বিরুদ্ধে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, সে জনৈকা নারীর সঙ্গে হারাম কাজ করেছে। প্রতিবারই নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পঞ্চমবার সে একথা বললে তিনি তার দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কি তার সঙ্গে যেনা করেছ সে বললো, হাঁ। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ তোমার লজ্জাস্থান কি তার লজ্জাস্থানে ঢুকেছে? সে বললো, হাঁ। তিনি বললেনঃ যেরূপ সুরমা শলাকা সুরমা দানীতে ঢুকে যায় এবং রশি যেরূপ কূপের মধ্যে ঢুকে পড়ে? সে বললো, হাঁ। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কি জান, যেনা কি? সে বললো, হাঁ, কোন ব্যাক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে বৈধভাবে যে সহবাস করে, আমি ঐ নারীর সঙ্গে অবৈধভাবে তা করেছি। তিনি বললেনঃ তোমার একথা বলার উদ্দেশ্য কী? সে বললো, আপনি আমাকে পবিত্র করবেন, এটাই আমার উদ্দেশ্য। অতঃপর তিনি আদেশ দিলেন তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হলো। অতঃপর আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনতে পান যে, তাঁর দু’জন সাহাবী একে অপরকে বলছেন লোকটিকে দেখো, আল্লাহ যার অপরাধ গোপন রাখলেন, অথচ নিজেকেই সে রক্ষা করতে পারলো না, অতঃপর কুকুরের মত তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হলো। তিনি তাদের একথা শুনে চুপ থকলেন এবং কিছু সময় চলার পর একটি গাধার লাশের নিকট এলেন যার পা উপরের দিকে উঠেছিল। তিনি বললেনঃ অমুক অমুক কোথায়? তারা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এখানে। তিনি বললেনঃ তোমরা দু’জন নেমে গিয়ে এ গাধার গোশত খাও। তারা বললো, হে আল্লাহর নাবী! এটা কি কেউ খেতে পারে? তিনি বললেনঃ তোমরা এখন তোমাদের এক ভাইয়ের মর্যাদা নিয়ে যেরূপ মন্তব্য করেছ, তা এর গোশত খাওয়ার চাইতেও গুরুতর। সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয়ই সে এখন জান্নাতের ঝর্ণাসমূহে আনন্দে ডুব দিচ্ছে।
✓আবু দাউদ শরীফ-৪৪২৭

৪. ব্যভিচারের শাস্তির ধরন
ইসলামী শরীয়তে ব্যভিচারের শাস্তি দুই প্রকার:

১. বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে (মুহসান):
✓পাথর ছুঁড়ে হত্যা (রজম)।
✓এর শর্ত হলো—সে বিবাহিত এবং সহবাসের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
২. অবিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে (গয়র মুহসান):
✓একশত বেত্রাঘাত।
✓এবং এক বছর নির্বাসন বা দেশান্তর।

✓আল্লাহ বলেন—
“ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ—তোমরা উভয়কে শত বেত্রাঘাত করো। যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকাল বিশ্বাস করো, তবে এ শাস্তি কার্যকর করতে তোমাদের মনে কোনো দয়া যেন না আসে।”
(সূরা আন-নূর: ২)

৫. নবী ﷺ এর ন্যায়বিচার ও করুণার দৃষ্টান্ত

উপরোক্ত হাদীসে দেখা যায়, নবী ﷺ চারবার পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নেন—যাতে ব্যক্তি নিজে গুনাহ স্বীকার থেকে বিরত থাকে এবং তওবার সুযোগ পায়। এটি নবীর দয়া ও ক্ষমাশীলতার প্রতীক। কিন্তু সে ব্যক্তি যখন আল্লাহর কাছে পরিশুদ্ধ হতে দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করে, তখন শরীয়তের দণ্ড কার্যকর হয়।

ঘটনার পর নবী ﷺ যখন শুনলেন যে, কিছু সাহাবী নিহত ব্যক্তির সমালোচনা করছে, তখন তিনি বললেন—
“তোমরা তোমাদের ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলেছ যা মৃত গাধার গোশত খাওয়ার চেয়েও নিকৃষ্ট। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! সে এখন জান্নাতের ঝর্ণাসমূহে আনন্দে ডুব দিচ্ছে।”
(আবু দাউদ, হাদীস ৪৪২৭)
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে নিজের অপরাধ স্বীকার করে শাস্তি গ্রহণ করে, আল্লাহ তার প্রতি ক্ষমাশীল হন এবং তাকে জান্নাতের সুখ দান করেন।

৬. ইসলামী সমাজে ব্যভিচার রোধের উপায়
ইসলাম শুধু শাস্তি দিয়েই ব্যভিচার রোধ করে না; বরং এর উৎস ও কারণগুলোও বন্ধ করে দেয়। এর জন্য ইসলাম দিয়েছে কিছু মৌলিক দিকনির্দেশনা—

১. দৃষ্টি সংযম করা:
“মুমিন পুরুষদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে...” (সূরা আন-নূর: ৩০)
“মুমিন নারীদের বল, তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে...” (সূরা আন-নূর: ৩১)
২. শালীন পোশাক পরিধান ও পর্দা পালন।
৩. বিয়ে সহজ করা এবং ব্যভিচারের বিকল্প হিসেবে বৈধ পথ খোলা রাখা।
৪. মিশ্র সমাজ ও অবাধ সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা।
৫. গিবত, কুত্সা ও সন্দেহ থেকে দূরে থাকা।
এই বিধানগুলো সমাজকে পবিত্র ও নিরাপদ রাখে।

৭. সাবালকত্ব ও ব্যভিচারের শাস্তির পারস্পরিক সম্পর্ক
একজন মানুষ যখন অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকে, তখন তার উপর শরীয়তসম্মত শাস্তি (হাদ) কার্যকর হয় না, কারণ তখন তার বিবেক ও বুদ্ধি পূর্ণ বিকশিত হয়নি। কিন্তু একবার সাবালক বা বালেগ হলে, সে নিজের আমলের দায়ভার বহন করবে। তখন সে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো গুনাহ করলে তা শাস্তিযোগ্য হয়।
অতএব, সাবালকত্ব ইসলামী দায়িত্বের সূচনাবিন্দু—আর ব্যভিচার সেই দায়িত্বের লঙ্ঘন। এই দুই বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

৮. শিক্ষণীয় দিক

১. ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে—অবুঝ শিশুর ওপর নয়, বুঝদার মানুষের ওপর দায়িত্ব চাপায়।
২. ব্যভিচার শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়।
৩. শরীয়তের শাস্তি কেবল প্রতিশোধ নয়—বরং সমাজকে পবিত্র রাখার উপায়।
৪. যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তওবা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন—even যদি সে সবচেয়ে বড় গুনাহও করে থাকে।

✓৯. উপসংহার

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। এখানে বালেগ হওয়া মানে শুধু শারীরিক পরিপক্বতা নয়, বরং দায়িত্ববোধ ও আত্মসমালোচনার সূচনা। আর ব্যভিচার—যা সমাজের পবিত্রতা বিনষ্ট করে—তার বিরুদ্ধে ইসলাম কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো, নিজেকে পবিত্র রাখা, হারাম পথ থেকে দূরে থাকা, এবং সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই ইসলামী নৈতিকতায় গড়ে তোলা—যাতে তারা সাবালক হলে ঈমান ও নীতিতে অটল থাকতে পারে।

শেষ কলমে,
মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ