ছোট গল্প: দ্বিতীয় বিবাহ, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:২৮/০৯/২০২৫
ছোট গল্প: দ্বিতীয় বিবাহ
সবুজ শ্যামল গ্রাম কাশেমপুর। চারদিকে ধানক্ষেত, পুকুরের জলে কচুরিপানা, সন্ধ্যার পর মসজিদের আজানের সুর ভেসে আসে। এই গ্রামেই বাস করতেন ইব্রাহিম খাঁ—গ্রামের সম্মানিত মুরুব্বি, ধনবান ও প্রভাবশালী। তার সংসারে স্ত্রী ছকিনা বিবি আর চারটি সন্তান। সংসার পরিপাটি, আল্লাহর ইচ্ছায় কারো অভাব ছিল না।
তবে ইব্রাহিম খাঁর মনে হল আরেকটি বিয়ে করলে মন্দ হয় না। টাকা-পয়সার অভাব নেই, লোকজনও তাকে দারুণ সম্মান করে। তাই তিনি দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।
এই খবর পৌঁছাল তার স্ত্রী ছকিনা বিবির কানে। তিনি প্রথমে চুপচাপ সহ্য করলেন, কিন্তু ভিতরে ভিতরে দুঃখে ভেঙে পড়লেন। একদিন সাহস করে স্বামীর সামনে দাঁড়ালেন। চোখে পানি, কণ্ঠে কাঁপুনি—
—“আপনি তো আমাদের অভাব পূর্ণ করেছেন, আমাদের চারটা সন্তান আছে। আমার দোষ কোথায় যে আবার বিয়ে করার প্রয়োজন হলো?”
ইব্রাহিম খাঁ কঠিন গলায় বললেন—
—“বিয়েতে কোনো দোষ নেই, ইসলাম অনুমতি দিয়েছে। চারটা পর্যন্ত বিয়ে করা যায়।”
এই কথা শুনে ছকিনা বিবির বুক ফেটে কান্না এল। তিনি বললেন—
—“হ্যাঁ, ইসলাম অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু ইসলাম তো এটাও বলেছে, যদি সমান হক আদায় করতে না পারো, তবে একটিতেই সীমাবদ্ধ থাকো। আপনি কি পারবেন দুইজনকে সমানভাবে ভালোবাসতে? আপনি কি জানেন, আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কন্যা ফাতিমা (রাযি.)-কে কষ্ট দেওয়া যাবে না বলে হযরত আলী (রাযি.)-কে দ্বিতীয় বিয়েতে নিষেধ করেছিলেন?
কারণ স্ত্রীর হৃদয়ে কষ্ট ঢুকানো মানেই তার হক নষ্ট করা।”
"যে ব্যক্তি দুইটি বিবাহ করে অথচ দুইটি স্ত্রীর মধ্যে সমতা রক্ষা করে না আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কাল কেয়ামতের দিন তাকে অর্ধেক পঙ্গু অবস্থায় উত্তোলন করবেন।"
গ্রামের ইমাম সাহেবও এ নিয়ে কথা বললেন। তিনি মসজিদের বারান্দায় বসে ইব্রাহিম খাঁকে বললেন—
—“হুজুর, আপনার শারীরিক সামর্থ্য আছে, আর্থিক সামর্থ্যও আছে—এতে সন্দেহ নেই। তবে বহুবিবাহ সবসময় কল্যাণ বয়ে আনে না। অনেক সময় এর ফলে ঝগড়া-ফ্যাসাদ হয়, সন্তানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ইসলাম যেমন অনুমতি দিয়েছে, তেমনই সতর্কও করেছে। আর আপনি যদি প্রথম স্ত্রীর অন্তরে আঘাত দেন, সেটি বড় জুলুম হবে।”
এই কথা শুনে ইব্রাহিম খাঁ কিছুটা নীরব হলেন। রাতের আঁধারে তিনি আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে ভাবলেন—“ফাতিমা আমার কলিজার টুকরা”—এই হাদিসটি যেন কানে বাজছে। তিনি বুঝলেন, প্রথম স্ত্রীর অশ্রু শুধু তার স্ত্রী নয়, তার সন্তানের বুকেও আগুন ধরিয়ে দেবে।
পরদিন সকালে তিনি পরিবারের সবাইকে একত্রিত করলেন। ছকিনা বিবির চোখে তখনো কান্নার দাগ। ইব্রাহিম খাঁ শান্ত কণ্ঠে বললেন—
—“আমি ভেবেছিলাম আরেকটা বিয়ে করলে ভালো হবে। কিন্তু বুঝতে পারলাম, এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি নেই। তোমাদের মন খারাপ হলে আমিও শান্তি পাব না।
তোমাদের সবার হাসিই আমার জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ।” তবে আপনি যদি আমাদের সন্তান ও আরেকটি বিবাহ করে সকলের মধ্যে সমতা রক্ষা করতে পারেন তাহলে আমার কোন আপত্তি নেই এবার ইব্রাহিম খাঁ বুঝতে পারলেন তার স্ত্রী তাকে কতটা ভালোবাসেন।
ছকিনা বিবির চোখ ভিজে গেল আনন্দে। সন্তানরা বাবার গলা জড়িয়ে ধরল। ইব্রাহিম খাঁর মনে তখন অদ্ভুত শান্তি নেমে এল।
গ্রামের লোকেরা বলল—
—“মুরুব্বি ইব্রাহিম খাঁ সত্যিই বিজ্ঞ মানুষ। তিনি বুঝেছেন, সবসময় দ্বিতীয় বিয়েতে কল্যাণ থাকে না। আসল কল্যাণ সংসারের ভালোবাসা অটুট রাখা।”
এভাবেই কাশেমপুর গ্রামে শান্তি ফিরে এল। সন্ধ্যার আজানে সবাই মসজিদে ছুটল, আর আকাশের পাখিরা যেন গান গাইতে লাগল—
“স্ত্রীর চোখের অশ্রু শুকিয়ে গেলে, সংসারের হাসি ফিরে আসে।”
🌺এই গল্পটি হাদিসের মূল শিক্ষা (স্ত্রীর হৃদয়ে কষ্ট না দেওয়া, সমান হক আদায় করা, ও বহুবিবাহের ক্ষেত্রে ইসলামের সতর্কতা) গ্রামীণ জীবনের প্রেক্ষাপটে ফুটিয়ে তোলা হলো।
Copyright ©️ All rights reserved by author Faridul Islam



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন