পারিবারিক শৃঙ্খলা নষ্টকারী স্বামী স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টিকারী লোকদের ব্যাপারে ইসলাম।

  পারিবারিক শৃঙ্খলা নষ্টকারী স্বামী স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টিকারী লোকদের ব্যাপারে ইসলাম।


মানবজীবনের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে মিথ্যা, প্রতারণা ও পারিবারিক কলহ। এসব কার্যকলাপ কেবল পারিবারিক সম্পর্ককেই ভেঙে দেয় না, বরং সমাজের ভেতর ঘৃণা, হিংসা ও শত্রুতার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কুরআন ও হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—যে ব্যক্তি মানুষকে বিভ্রান্ত করে, মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে ও পরিবারে বিবাদ সৃষ্টি করে, সে প্রকৃতপক্ষে শয়তানের কাজ করছে এবং নিজেও শয়তানের দলে অন্তর্ভুক্ত।


১. ইসলামে মিথ্যা ও প্রতারণার শাস্তি

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

> "হে ঈমানদারগণ! তোমরা মিথ্যা কথা থেকে বেঁচে থাকো।" (সূরা হজ্জ, ২২:৩০)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

> "মুনাফিকের তিনটি লক্ষণ আছে: সে কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে, আমানত পেলে খিয়ানত করে।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)


অতএব, মিথ্যা ও প্রতারণা কোনো ছোট অপরাধ নয়; বরং তা মানুষের ঈমান ধ্বংস করে এবং তাকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

২. পারিবারিক কলহ সৃষ্টির পরিণতি

পরিবার সমাজের মূল ভিত্তি। যদি পরিবার ভেঙে যায়, তবে সমাজ অশান্ত হবে।

ইসলামে স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের মধ্যে শান্তি ও ভালোবাসা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কলহ সৃষ্টি বা বিচ্ছেদ ঘটানোর প্রচেষ্টা ইসলামে নিষিদ্ধ এবং এটি শয়তানের প্রিয় কাজ হিসেবে বিবেচিত।


📜 কুরআন ও হাদিসের আলোকে:


সূরা বাকারা, আয়াত ১০২-এ উল্লেখ রয়েছে:


> "তারা তাদের কাছে এমন জাদু শিখতো যা দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়।"

(সূরা বাকারা, আয়াত ১০২)


এই আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্য জাদু শেখা একটি অশুভ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

‎জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

 ইবলীস পানির উপর তার আরশ স্থাপন করতঃ তার বাহিনী প্রেরণ করে। তম্মধ্যে তার সর্বাধিক নৈকট্য অর্জনকারী সে-ই যে সবচেয়ে বেশী ফিতনা সৃষ্টিকারী। তাদের একজন এসে বলে, আমি অমুক অমুক কাজ করেছি। সে বলে, তুমি কিছুই করনি। অতঃপর অন্যজন এসে বলে, অমুকের সাথে আমি সকল প্রকার ধোঁকার আচরণই করেছি। এমনকি তার থেকে তার স্ত্রীকে আলাদা করে দিয়েছি। তারপর শাইতান তাকে তার নিকটবর্তী করে নেয় এবং বলে হ্যাঁ, তুমি খুব ভাল।

রাবী আ‘মাশ বলেন, আমার মনে হয় তিনি বলেছেনঃ অতঃপর শাইতান তার সাথে আলিঙ্গন করে। (ই.ফা. ৬৮৪৬, ই.সে. ৬৯০২)

সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৯৯৯

এই হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর প্রচেষ্টা একটি বড় ফিতনা এবং এটি শয়তানের প্রিয় কাজ।

সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৪৩২-এ আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত:

> "কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বিছানায় আহ্বান করে, কিন্তু সে তা অস্বীকার করে, নিঃসন্দেহে যে পর্যন্ত সে তার স্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্টি না হয়, ততক্ষণ আসমানবাসী তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকে।"

(সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৪৩২)


আরেকটি হাদীসে এসেছে:

"শয়তান সবচেয়ে বেশি খুশি হয় যখন সে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে।"

অতএব, যে ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ লাগায়, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া বাধায়, সে সরাসরি শয়তানের কাজ করছে।

১. কুরআনের দিকনির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

> “তাঁদের মধ্যে আমি ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছি।”

(সূরা রূম, ৩০:২১)

অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো দয়া, ভালোবাসা ও শান্তির সম্পর্ক।


২. হাদিসে দাম্পত্য সম্পর্কে দিকনির্দেশনা

✓রাসূলুল্লাহ ﷺ স্ত্রীদের সাথে সুন্দর ব্যবহার করার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন—

“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করে।”

(সুনান তিরমিযী, হাদিস: ৩৮৯৫)


✓তিনি আরও বলেছেন:

“নারীদের সম্পর্কে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছো।”

(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)


✓স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্য করতে বলা হয়েছে (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম) —  এর অর্থ সংসার রক্ষার জন্য পারস্পরিক দায়িত্ব।

✓“যদি আমি কাউকে অন্য কারও জন্য সেজদা করার অনুমতি দিতাম তবে স্ত্রীকে স্বামীর জন্য সেজদা করার অনুমতি দিতাম।” (তিরমিযী, হাদিস: ১১৫৯) — এটি কোনোভাবেই স্ত্রীর অপমান নয়; বরং স্বামীর প্রতি কর্তব্যের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আলংকারিক উপমা।

✓কিন্তু মানুষ যখন এসব হাদিসের প্রেক্ষাপট না বুঝে আংশিক উদ্ধৃতি করে, তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।

৩. বর্তমান আইনের আলোকে ব্যবস্থা

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী—

১.মিথ্যা সাক্ষ্য (False Evidence): দণ্ডবিধির ১৯৩ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা সাক্ষ্যের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

২.পারিবারিক কলহ সৃষ্টি: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ইত্যাদিতে স্পষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।

৩.মানহানি ও অপবাদ: দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানিকর মিথ্যা বক্তব্যের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। কাউকে গালি দেওয়া ছোট করা মিথ্যা অপবাদ দেওয়া ইত্যাদির এর মধ্যে গণ্য।

৪. প্রতিকার ও করণীয়

১. আধ্যাত্মিক প্রতিকার:

পরিবারে আল্লাহর জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত চালু রাখা।

পারস্পরিক আস্থা, ভালোবাসা ও পরামর্শের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা।

শয়তানের কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে নিয়মিত ইস্তেগফার ও দোয়া করা।

২. সামাজিক প্রতিকার:

মিথ্যা ও প্রতারণাকারীকে সমাজে বর্জন করা।

সালিশ বা মীমাংসার মাধ্যমে কলহ মিটিয়ে ফেলা।


৩. আইনগত প্রতিকার:

প্রতিহিংসা বা পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী মামলা করা।

নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার রক্ষায় আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা।


উপসংহার

মিথ্যা, প্রতারণা ও পারিবারিক কলহ সৃষ্টিকারী ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে শয়তানের সহযোগী। ইসলাম এদের কঠোরভাবে নিন্দা করেছে এবং আইনও তাদের শাস্তি নির্ধারণ করেছে। তাই আমাদের উচিত—নিজেকে মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে দূরে রাখা, পরিবারকে শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা করা এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

👉 সত্য, ন্যায় ও শান্তির পথে ফিরে আসাই মানুষের জন্য কল্যাণকর।

copyright ©️ All rights reserved by author

 maulana MD FARIDUL Islam 

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ