বাল’আম ইবনে বাউ’রার করুণ গল্প: জ্ঞানের আলো থেকে লোভের অন্ধকারে, রচনায়: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:২১/৯/২০২৫
বাল’আম ইবনে বাউ’রার করুণ গল্প: জ্ঞানের আলো থেকে লোভের অন্ধকারে: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
একসময় সিরিয়ার বায়তুল মুকাদ্দাসের কাছাকাছি কেনআন অঞ্চলে বাস করতেন এক মহান পণ্ডিত। তার নাম ছিল বাল’আম ইবনে বাউ’রা। তিনি ছিলেন বনী-ইসরাঈলের একজন অত্যন্ত সম্মানিত আলেম, যিনি আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন এবং 'ইসমে আ'যম' জানতেন—এমন এক পবিত্র নাম, যার মাধ্যমে করা দোয়া আল্লাহ কবুল করতেন। তার জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা এতটাই উঁচু ছিল যে, সবাই তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত।
ফেরাউনের ধ্বংসের পর, যখন হযরত মুসা (আ.) এবং বনী-ইসরাঈলদের 'জাব্বারীন' সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ এলো, তখন 'জাব্বারীন'রা ভীত হয়ে পড়ল। তারা বাল’আমের কাছে এসে বলল, "হে বাল’আম, মুসা (আ.) খুব শক্তিশালী, তার সাথে বিশাল সৈন্যদল। তারা এসেছে আমাদের দেশ থেকে আমাদের তাড়িয়ে দিতে। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যাতে তিনি তাদের ফিরিয়ে দেন।"
বাল’আম তাদের প্রস্তাবে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বললেন, "তোমরা একি বলছ! মুসা তো আল্লাহর নবী, তার সাথে রয়েছেন আল্লাহর ফেরেশতারা। আমি কিভাবে তার বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে পারি? এমন কাজ করলে আমার দুনিয়া ও আখিরাত—সবই ধ্বংস হয়ে যাবে।"
প্রথমে বাল’আম এই অন্যায় কাজ করতে রাজি হননি। তিনি আল্লাহর কাছে জানতে চাইলেন, এই ব্যাপারে কিছু করা উচিত কিনা। স্বপ্নে তাকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হলো। তিনি সম্প্রদায়কে জানালেন যে, বদদোয়া করতে তাকে বারণ করা হয়েছে।
কিন্তু লোভের বীজ তখনো তার মনে পোঁতা হয়নি। সমাজপতিরা তাকে লোভনীয় উপঢৌকন দিল, যা ছিল একপ্রকার ঘুষ। প্রথমে তিনি ইতস্তত করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উৎকোচ গ্রহণ করলেন। তার স্ত্রীও তাকে এই পাপ কাজে প্ররোচিত করল। সম্পদের মোহ এবং স্ত্রীর সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা তার জ্ঞান ও বিবেকের ওপর এক কালো পর্দা টেনে দিল।
বাল’আমের পতনের শুরু হলো। তিনি যখন মুসা (আ.) ও বনী-ইসরাঈলের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে লাগলেন, তখন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। তার মুখ দিয়ে যা বের হচ্ছিল, তা ছিল তার নিজের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বদদোয়া! বাল’আম হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন, তার জিহ্বা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। সবাই চিৎকার করে উঠল, "আপনি তো আমাদেরই বিরুদ্ধে বদদোয়া করছেন!" বাল’আম অসহায়ভাবে বললেন, "আমার জিহ্বা আমার কথা শুনছে না!"
তার পাপের শাস্তি হিসেবে তার জিহ্বা বেরিয়ে এসে বুকের ওপর ঝুলে পড়ল। তার সমস্ত জ্ঞান ও মর্যাদা চোখের পলকে বিলুপ্ত হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি সবকিছু হারিয়েছেন। কিন্তু তার পৈশাচিক বুদ্ধি তখনো তাকে ছেড়ে যায়নি।
তিনি তার সম্প্রদায়কে একটি ঘৃণ্য কৌশল শিখিয়ে দিলেন। বললেন, "তোমরা তোমাদের সুন্দরী নারীদেরকে সাজিয়ে বনী-ইসরাঈলের সৈন্যদের কাছে পাঠিয়ে দাও। তাদের বলো, যদি সৈন্যরা তাদের সাথে খারাপ কাজ করতে চায়, যেন তারা বাধা না দেয়। বনী-ইসরাঈলের সৈন্যরা দীর্ঘদিন ঘর থেকে দূরে আছে। তারা যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তবে আল্লাহর গজব তাদের ওপর নেমে আসবে এবং তারা কখনও বিজয়ী হতে পারবে পারবে না।"
বাল’আমের এই পৈশাচিক পরিকল্পনা কাজ করে গেল। বনী-ইসরাঈলের এক নেতা এই ফাঁদে পা দিলেন। হযরত মুসা (আ.) তাকে শত বারণ করেও থামাতে পারলেন না।
এর ফল ছিল ভয়াবহ। বনী-ইসরাঈলের মধ্যে এক কঠিন প্লেগ ছড়িয়ে পড়ল। একই দিনে সত্তর হাজার মানুষ মারা গেল। অবশেষে যারা এই পাপকাজ করেছিল, তাদের প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হলো। সবাই তওবা করার পর প্লেগ থামল।
বাল’আম ইবনে বাউ'রার ঘটনা আমাদের শেখায় যে, জ্ঞান ও মর্যাদা কোনো মানুষকে চিরকাল রক্ষা করতে পারে না, যদি সে লোভ, অহংকার এবং স্বার্থপরতাকে নিজের ওপর প্রবল হতে দেয়। কোরআনের ভাষায়, তার জ্ঞান ছিল তার জন্য পোশাকের মতো, যা সে নিজ হাতে খুলে ফেলে দিয়েছিল। সে জ্ঞানের আলো থেকে বেরিয়ে এসে লোভের এক গভীর ও অন্ধকার গহ্বরে পতিত হয়েছিল।
(তাফসিরে মায়ারেফুল কোরআন)
(সূরা আল আরাফ)
copyright ©️ All rights reserved by author
maulana MD FARIDUL Islam



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন