পালিত পুত্র ও পালিত কন্যার সাথে সম্পর্কের ইসলামী বিধান, রচনায়: মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:২৬/০৯/২০২৫

 পালিত পুত্র ও পালিত কন্যার সাথে সম্পর্কের ইসলামী বিধান


ইসলামে দত্তক বা পালিত সন্তান (adoption/fostering) সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম মানবিক সম্পর্ক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, যাতে কেউ ভুল পথে না যায় এবং পরিবার-সমাজে শির্ক, জাহেলিয়াত কিংবা অপসংস্কৃতির প্রভাব না পড়ে। বিশেষত “পালিত পুত্র” ও “পালিত কন্যা” সম্পর্কিত বিষয়টি কুরআন ও হাদীসে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।



১. কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তায়ালা সূরা আহযাবে বলেছেন:

> "আল্লাহ তোমাদের পালিত সন্তানদের তোমাদের প্রকৃত সন্তান বানাননি। এটা কেবল তোমাদের মুখের কথা। আর আল্লাহ সত্য কথা বলেন, তিনিই সঠিক পথে পথপ্রদর্শন করেন। তাদেরকে তাদের প্রকৃত পিতার নামে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ন্যায্য কথা। আর যদি তোমরা তাদের পিতাকে না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই এবং তোমাদের বন্ধু।"

(সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪-৫)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হলো—

✓পালিত সন্তানকে নিজ সন্তানের মর্যাদা দেওয়া যাবে না।

✓তাদেরকে অবশ্যই প্রকৃত পিতার নামেই ডাকতে হবে।

✓পিতৃপরিচয় গোপন করে নিজের নামের সাথে জুড়ে দেওয়া ইসলামবিরোধী।


২. হাদীসের বর্ণনা

✓আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে বলতে শুনেছেন, কোন লোক যদি নিজ পিতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও অন্য কাকে তার পিতা বলে দাবী করে তবে সে আল্লাহ্‌র কুফরী করল এবং যে ব্যক্তি নিজেকে এমন বংশের সঙ্গে বংশ সম্পর্কিত দাবী করল যে বংশের সঙ্গে তার কোন বংশ সম্পর্ক নেই, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৫০৮)

হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

‎✓আয়িশাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “দুগ্ধ সম্পর্ক সে সব লোকদের হারাম করে দেয়, যাদের জন্মগত সম্পর্ক হারাম করে।” (ই.ফা. ৩৪৩৪, ই.সে. ৩৪৩৩)

সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৪৬১


এ থেকে বোঝা যায়— নিজস্ব পিতার পরিচয় গোপন করে অন্য কারো নামের সাথে পরিচয় জুড়া মারাত্মক গুনাহ।


৩. মাহরাম সম্পর্কের বিধান


পালিত ছেলে পালক মায়ের মাহরাম নয়। তাই বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর তার জন্য হিজাব মানতে হবে এবং নির্জন সাক্ষাৎ বৈধ নয়।

একইভাবে পালিত মেয়ে পালক বাবার মাহরাম নয়। তাই সাবালিকা হওয়ার পর তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, নির্জনে থাকা, স্পর্শ করা, অথবা মুক্তভাবে চলাফেরা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।


ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, কোন পুরুষ যেন অপর মহিলার সঙ্গে নিভৃতে অবস্থান না করে, কোন স্ত্রীলোক যেন কোন মাহরাম সঙ্গী ছাড়া সফর না করে। এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রসূল! অমুক যুদ্ধের জন্য আমার নাম লেখা হয়েছে। কিন্তু আমার স্ত্রী হজ্জযাত্রী। তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘তবে যাও তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ্জ কর।’

সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩০০৬


৪. দুধের সম্পর্ক (রিযা’ই) ব্যতিক্রম

যদি পালিত শিশুকে শৈশবে দু’বছরের মধ্যে দুধ পান করানো হয়, তবে সে শিশুর সাথে দুধের সম্পর্ক (রিযা’ই সম্পর্ক) স্থাপিত হয়। তখন সে পালক পরিবারের জন্য মাহরাম হয়ে যাবে অর্থাৎ তার সাথে দেখা সাক্ষাৎ করা বৈধ হবে।, 

রক্ত সম্পর্কের কারণে যাদের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ, দুধ সম্পর্কের কারণেও তাদের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ।(আধুনিক প্রকাশনী- ৪৭২৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭২৮)

সহীহ বুখারী -৫০৯৯

অর্থাৎ, দুধের সন্তানও প্রকৃত সন্তানের মতো মাহরাম হবে। তবে দুধ না খাওয়ালে এই সম্পর্ক হবে না।


৫. সামাজিক দায়িত্ব

ইসলাম পালিত সন্তানের প্রতি অবহেলা করতে বলে না। বরং তাদের লালন-পালন, শিক্ষা, ভরণ-পোষণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ – এগুলো অনেক বড় সওয়াবের কাজ। কিন্তু এ কাজ করতে হবে ইসলামী সীমারেখার ভেতরে থেকে।


সাহ্‌ল (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমি ও ইয়াতীমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনিভাবে নিকটে থাকবে। এই বলে তিনি শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুল দু'টি দ্বারা ইঙ্গিত করলেন এবং এ দুটির মাঝে কিঞ্চিত ফাঁক রাখলেন।(আধুনিক প্রকাশনী- ৪৯১৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৮০৮)

সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫৩০৪

হাদিসের মান: সহিহ হাদিস



তবে এতিম বা পালিত সন্তানকে নিজের ছেলে-মেয়ে বানিয়ে ফেলা, বংশ পরিবর্তন করা বা মাহরাম মনে করা শির্ক ও বিদআতের পথে নিয়ে যায়।

৬. উপসংহার

১. পালিত পুত্র বা কন্যাকে প্রকৃত পিতার নামে পরিচিত করতে হবে, নিজের নামে নয়।

২. সাবালক হওয়ার পর পালিত পুত্রের সাথে পালক মায়ের, অথবা পালিত কন্যার সাথে পালক বাবার নির্জন সাক্ষাৎ বৈধ নয়।

৩. পালিত সন্তানের লালন-পালন, ভরণ-পোষণ ও শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

৪. যদি ছোটবেলায় দুধ পান করানো হয়, তবে মাহরাম সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, তখন নির্জনে সাক্ষাৎ বৈধ।


✍ প্রবন্ধের শেষ কথা

ইসলামের মূলনীতি হলো—আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হারামই রাখতে হবে, আর যা হালাল করেছেন তাকে হালাল রাখতে হবে। দত্তক প্রথা ইসলাম স্বীকৃতি দেয়, তবে বংশের পরিচয় গোপন করা ও অমাহরামকে মাহরাম ভাবার ভ্রান্তি ইসলাম দূর করেছে। তাই মুসলমানের দায়িত্ব হলো—অভিভাবকসুলভ দায়িত্ব পালন করা, কিন্তু ইসলামী সীমারেখা মেনে।


মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺

Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam 

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ