হাদীসে কুদসীর বিশ্লেষণ: রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:১৯/০৯/২০২৫

 

আবূ যর আল-গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীস, যা হাদীসে কুদসী নামে পরিচিত। হাদীসে কুদসী মানে হলো—বক্তব্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে, কিন্তু বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। এটি মুসলিম শরীফে (হাদীস নং ২৫৭৭) বর্ণিত। এখন চলুন ধাপে ধাপে এর ব্যাখ্যা দেওয়া যাক।

হাদীসের ব্যাখ্যা
১. আল্লাহ যুলুমকে হারাম করেছেন
“হে আমার বান্দাগণ! আমি যুলুমকে আমার জন্য হারাম করে দিয়েছি, আর তা তোমাদের মধ্যেও হারাম করে দিয়েছি; অতএব তোমরা একে অপরের উপর যুলুম করো না।”
আল্লাহ তাআলা ন্যায়বিচারকারী, তিনি কখনো কারো প্রতি যুলুম করেন না।
আল্লাহ নিজ সত্তার জন্যও যুলুমকে হারাম করেছেন।
বান্দাদের জন্যও যুলুম করা সম্পূর্ণ হারাম করা হলো।
যুলুম হতে পারে তিন প্রকার:
১. শিরক – যা সবচেয়ে বড় যুলুম। (সূরা লুকমান ৩১:১৩)
২. নিজের উপর যুলুম – গুনাহ করে নিজের ক্ষতি করা।
৩. অন্যের উপর যুলুম – কারো হক মেরে ফেলা, কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি।

২. হেদায়াত শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে
“হে আমার বান্দাগণ! আমি যাকে হেদায়াত দিয়েছি সে ছাড়া তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট। সুতরাং আমার কাছে হেদায়াত চাও, আমি তোমাদের হেদায়াত দান করব।”
মানুষের নিজের জ্ঞান ও চেষ্টা যথেষ্ট নয়, আল্লাহর দয়া ছাড়া হেদায়াত পাওয়া যায় না।
এজন্য আমরা প্রতিদিন নামাজে দোয়া করি: "اهدنا الصراط المستقيم" – হে আল্লাহ! আমাদের সরল পথ দেখাও।

৩. রিজিক আল্লাহর কাছ থেকে
> “হে আমার বান্দাগণ! আমি যাকে অন্ন দান করেছি, সে ছাড়া তোমরা সকলেই ক্ষুধার্ত… কাপড় দান করেছি সে ছাড়া তোমরা সকলেই বিবস্ত্র।”
খাদ্য, বস্ত্র ও যাবতীয় রিজিক আল্লাহই দেন।
মানুষ চেষ্টা করে, কিন্তু ফলাফল দেন একমাত্র আল্লাহ।
✓তাই আমাদের উচিত বৈধ উপায়ে রিজিক খোঁজা এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।

৪. গুনাহ ও ক্ষমা
“হে আমার বান্দাগণ! তোমরা রাতদিন গোনাহ করছ, আর আমি তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দেই। সুতরাং আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেব।”
মানুষ ভুল করবে, গুনাহে জড়াবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু আল্লাহর দরবার সবসময় খোলা থাকে, ক্ষমা চাইলে তিনি মাফ করে দেন।
কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
> “হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সূরা যুমার ৩৯:৫৩)
৫. আল্লাহর কোন ক্ষতি-লাভ নেই
> “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা কখনোই আমার ক্ষতি করতে পারবে না… আমার ভালো করতে পারবে না।”
✓আমাদের ইবাদত বা গুনাহ আল্লাহর কোনো ক্ষতি বা উপকার করে না।
বরং আমাদের ইবাদত আমাদের জন্যই কল্যাণকর, আর গুনাহ আমাদের জন্যই ক্ষতিকর।

৬. সমস্ত মানুষ-জিন এক হলে ও আল্লাহর রাজত্বে কোনো পরিবর্তন হবে না
> যদি সব মানুষ-জিন মিলিয়ে সবচেয়ে পরহেজগার হয়েও যায়, তাতে আল্লাহর রাজত্বে কিছু বাড়বে না।

আবার সবাই যদি সবচেয়ে গুনাহগার হয়, তাতেও আল্লাহর কিছু কমবে না।
অর্থাৎ আল্লাহর মালিকানা, ক্ষমতা ও রাজত্ব নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ।
৭. দোয়া ও আল্লাহর ভাণ্ডার
“যদি তোমাদের পূর্বাপর মানুষ-জিন সবাই এক ময়দানে দাঁড়িয়ে আমার কাছে চায়, আর আমি তাদের সবকিছু দিয়ে দেই, তবে আমার কাছে যা আছে তা সমুদ্রে একটি সূঁই ডুবানোর মতো সামান্যও কমবে না।”
আল্লাহর ভাণ্ডার অসীম।
দুনিয়ার সব চাহিদা পূরণ করলেও আল্লাহর কাছে কোনো অভাব হবে না।
৮. আমল ও তার প্রতিফল
> “হে আমার বান্দাগণ! আমি তোমাদের আমল গণনা করে রাখি এবং তার পূর্ণ প্রতিফল দেব। তাই যে উত্তম প্রতিফল পাবে সে আল্লাহর প্রশংসা করবে, আর যে অন্য কিছু পাবে সে নিজেকেই দোষারোপ করবে।”
প্রতিটি কাজ লিখে রাখা হয় (ফেরেশতারা লেখেন)।
কিয়ামতের দিন তার ভিত্তিতেই হিসাব হবে।
✓সৎকাজের প্রতিদান পেলে আল্লাহর শুকরিয়া করা উচিত।
✓আর গুনাহর শাস্তি পেলে এর জন্য শুধু নিজের গাফেলতাকেই দায়ী করতে হবে।

সারসংক্ষেপ
এই হাদীস আমাদের কয়েকটি মৌলিক বিষয় শিক্ষা দেয়:
1. যুলুম সর্ব প্রকারে হারাম।
2. হেদায়াত, রিজিক, পোশাক সবই আল্লাহর নিয়ামত।
3. মানুষ গুনাহ করবে, কিন্তু তাওবা করলে আল্লাহ মাফ করে দেন।
4. আল্লাহর রাজত্ব আমাদের আমল দ্বারা বৃদ্ধি বা হ্রাস পায় না।
5. আল্লাহর ভাণ্ডার সীমাহীন, তাই শুধু তাঁর কাছেই চাইতে হবে।
6. কিয়ামতে প্রত্যেকের কাজের যথাযথ প্রতিফল দেওয়া হবে।

copyright ©️ All rights reserved by author

 maulana MD FARIDUL Islam 

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ