মজার গল্প: সুখের স্বপ্ন


করুন গল্প: সুখের স্বপ্ন 

মোহাম্মদ খলিল মিয়া স্থানীয় একটি বেসরকারি হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা পেশাকে তিনি ভালোবেসেই বেছে নিয়েছিলেন। ছাত্রদের চোখে নতুন জ্ঞানের আলো জ্বালানোই ছিল তার জীবনের পরম আনন্দ। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, ততই জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে কাবু করে ফেলে।

খলিল মিয়ার সংসারে স্ত্রী আর চারটি সন্তান। ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী, কিন্তু তাদের লেখাপড়ার খরচ, জামাকাপড়, বই-খাতা, চিকিৎসা—সব মিলিয়ে মাস শেষে বেতনের টাকাটা কেমন যেন উধাও হয়ে যায়। পরিবার চালানো যেন প্রতিদিনের এক অদৃশ্য যুদ্ধ।

একদিন তিনি দেখলেন, পাশের বাড়ির জসিম মিয়া—যিনি একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক—অন্যরকম নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করছেন। জসিম মিয়া মাস শেষে শুধু বেতনই পান না, তার সঙ্গে থাকে বাসাভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, সন্তানের শিক্ষা ভাতা, উৎসব বোনাস, এমনকি চাকরিজীবনের শেষে পেনশনের নিশ্চয়তাও। তার চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার কোনো ছাপ নেই।

খলিল মিয়া মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন—
“আমাদের কাজ কি কম? আমরা কি কম পড়াই? অথচ সরকারি আর বেসরকারির ফারাকটা যেন সৎ ছেলে আর আপন ছেলের মতো। একই পাঠ্যক্রম, একই দায়িত্ব, কিন্ত বেতন ভাতায়  আকাশপাতাল পার্থক্য।”

দিনের পর দিন এই বৈষম্য তাকে কুরে কুরে খেতে লাগল। রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুম আসতে চায় না। সংসারের খরচ কিভাবে মেটাবেন, ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষা কিভাবে দেবেন—এই দুশ্চিন্তাই যেন তার স্থায়ী সঙ্গী।

তার উপরে সাম্প্রতিক সময়ে কোচিং বন্ধের কড়াকড়ি আরও বড় দুঃশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে সামান্য টিউশন করে সংসারে কিছুটা সহায়তা করতে পারতেন। এখন সেই পথও বন্ধ। ফলে জীবন যেন আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু খলিল মিয়া সহজে হার মানার মানুষ নন। একদিন স্কুল শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে বসে বললেন,
“ভাইরা, এভাবে তো আর চলতে পারে না। আমরা শিক্ষক, জাতি গঠনের কারিগর। অথচ আমাদের জীবনই যখন অনিশ্চয়তায় ডুবে থাকে, তখন আমরা কিভাবে মন দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলব? আমাদেরও তো বাঁচতে হবে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে হবে।”

সহকর্মীরা একমত হলেন। ধীরে ধীরে এ আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়ল জেলা-উপজেলা জুড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বেসরকারি শিক্ষকরা তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলালেন।

শুরু হলো আন্দোলনের নতুন অধ্যায়। রাস্তায় ব্যানার-ফেস্টুনে ভরে উঠল, স্লোগানে গমগম করতে লাগল—
“শিক্ষক এক , বেতন এক চাই।”
“সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য মানি না।”

খলিল মিয়া হয়ে উঠলেন এ আন্দোলনের অগ্রদূত। তার দুঃখ, বঞ্চনা আর অসহায়তা একসময় শক্তিতে রূপ নিল। আশার আলো দেখল হাজারো শিক্ষক।

সমাজের মানুষও পাশে দাঁড়াতে শুরু করল। কারণ তারা বুঝল, শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, আর শিক্ষা বাঁচলে দেশ বাঁচবে।

খলিল মিয়া রাতের অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে দোয়া করলেন—
“হে আল্লাহ! আমাদের এই ন্যায্য দাবি পূর্ণ করে দাও। যেন আমার ছেলেমেয়েরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।”

গল্পটা এখানেই শেষ নয়। খলিল মিয়ার শুরু করা আন্দোলন একদিন বাস্তবে পরিণত হবে—এই বিশ্বাসই তাকে আগলে রাখল। কারণ তিনি জানেন, সত্যিকারের শিক্ষক কখনো হারে না।

🖋️ মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
Copyright ©️ All rights reserved by author Faridul Islam

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ