শিরোনাম:জ্ঞানের অহংকার ও হেয়প্রবণতার ভয়াবহতা, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:০১/১০/২০২৫
শিরোনাম:জ্ঞানের অহংকার ও হেয়প্রবণতার ভয়াবহতা
মানুষকে আল্লাহ্ তাআলা বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন তাঁর প্রদত্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কারণে। কুরআনে বলা হয়েছে:
“আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উঁচু করবেন।”
(সূরা মুজাদিলা: ১১)
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, জ্ঞান মানুষের উন্নতির সোপান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক সময় কিছু মানুষ জ্ঞানকে নিজের গর্ব, অহংকার ও অন্যকে হেয় করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এ ধরনের মানসিকতা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় ও ধ্বংসাত্মক।
১. জ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য
ইসলাম শিখিয়েছে যে, জ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য হলো—
✓আল্লাহ্কে চেনা,
✓তাঁর আনুগত্য করা,
✓মানুষের কল্যাণ করা,
✓সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু যখন জ্ঞান অহংকারের উপকরণে রূপ নেয়, তখন তা আর বরকতময় থাকে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণ করে আলেমদের সঙ্গে তর্ক করার জন্য, মূর্খদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য অথবা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য—তার স্থান জাহান্নাম।”
-সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৫৩
এ হাদিস প্রমাণ করে, জ্ঞান যদি উদ্দেশ্যহীনভাবে শুধু বাহাদুরি দেখানোর জন্য ব্যবহার হয়, তবে তা আখিরাতের জন্য ক্ষতির কারণ।
২. জ্ঞানকে অহংকারের অস্ত্র বানানো
✓যারা জ্ঞানের বাহাদুরি করে অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করে, তাদের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়—
✓তারা কথা বলার সময় অন্যের ভুল খুঁজে বেড়ায়।
✓নিজের মতামতকে সর্বদা চূড়ান্ত মনে করে।
✓অপরকে ছোট করার মাধ্যমে নিজেদেরকে বড় প্রমাণ করতে চায়।
✓বিনয় ও নম্রতা তাদের মাঝে হারিয়ে যায়।
✓জাবির বিন আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা আলিমদের উপর বাহাদুরি প্রকাশের জন্য, নির্বোধদের সাথে ঝগড়া করার জন্য এবং জনসভার উপর বড়ত্ব প্রকাশ করার জন্য ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা করো না। যে ব্যক্তি এরূপ করবে, তার জন্য রয়েছে আগুন আর আগুন। [২৫২]
ফুটনোট: [২৫২] সহীহ। তাখরীজ আলবানী: সহীহ তারগীব ১০২।
সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৫৪
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
এমন আচরণ মূলত শয়তানি প্ররোচনা। কারণ শয়তানও জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অহংকারেই আদম (আ.)-এর সামনে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
আল্লাহ্ বলেন:
“আমি তাকে (শয়তানকে) বলেছিলাম, আদমকে সিজদা করো। কিন্তু সে অহংকার করল এবং অবাধ্যদের অন্তর্ভুক্ত হলো।”
(সূরা বাকারা: ৩৪)
অতএব, জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও অহংকার করলে তা শয়তানের অনুসরণ ছাড়া আর কিছু নয়।
যারা জ্ঞান অনুসন্ধান করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের জন্য বলেন।
আল্লাহ বলেন -"যারা অনুসন্ধানপ্রিয় অথবা যারা কৃতজ্ঞতাপ্রিয় তাদের জন্যে তিনি রাত্রি ও দিবস সৃষ্টি করেছেন পরিবর্তনশীলরূপে।"
সূরা আল ফুরকান-৬১
৩. ইসলামে বিনয়ী হওয়ার শিক্ষা
ইসলাম বিনয়, নম্রতা ও পরস্পরকে সম্মান করার উপর জোর দিয়েছে। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে বিনয়ী।”
(মুসনাদ আহমদ)
আবার কুরআনে বলা হয়েছে:“রহমানের বান্দারা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খরা তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলে: সালাম।”
(সূরা ফুরকান: ৬৩)
অর্থাৎ প্রকৃত আলেম বা শিক্ষিত মানুষ হলেন তিনি, যিনি নিজের জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেন এবং অহংকার পরিহার করেন।
৪. জ্ঞানের অহংকারের পরিণতি
✓যারা জ্ঞানকে অহংকারের উপকরণ বানায়, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়াবহ পরিণতি রয়েছে।
✓দুনিয়াতে তারা মানুষের হৃদয়ে সম্মান হারায়। মানুষ তাদের জ্ঞানকে মূল্য দিলেও চরিত্রকে ঘৃণা করে।
✓আখিরাতে তারা আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখি হবে। রাসূল ﷺ সতর্ক করেছেন:
“আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ইল্মের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা যায়, কোন লোক যদি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য তা শিক্ষা করে, তবে সে ক্বিয়ামাতের দিন জান্নাতের সুগন্ধি পাবে না।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৬৬৪
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
৫. করণীয়
✓নিজের জ্ঞানকে সর্বদা আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে স্বীকার করা।
✓অহংকার থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
✓অন্যকে হেয় করার বদলে তাদেরকে সহানুভূতির সঙ্গে সংশোধন করা।
সর্বদা মনে রাখা—আমার চেয়ে বড় আলেম, গবেষক বা প্রাজ্ঞ ব্যক্তি পৃথিবীতে বহু আছেন। আমি আল্লাহর একজন নগণ্য খাদেম মাত্র।
উপসংহার
জ্ঞান একটি আলোকিত প্রদীপ, যা আল্লাহ মানুষকে উপহার দিয়েছেন। কিন্তু সেই আলো যদি অন্যকে পোড়াতে ব্যবহৃত হয়, তবে তা কল্যাণ বয়ে আনে না, বরং অন্ধকার বাড়ায়। তাই আমাদের উচিত জ্ঞানকে অহংকারের অস্ত্র না বানিয়ে বিনয়ের সঙ্গে ব্যবহার করা। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হলো—“যত বড় জ্ঞানী, তত বড় বিনয়ী।”
হযরত আলী (রা.) বলেছেন:
“যে যত জ্ঞানী, সে তত বিনয়ী।”
অতএব, আমরা যেন কখনো জ্ঞানের বাহাদুরি না করি, বরং আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকি এবং সেই জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজে লাগাই।
🖋️রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন