মজার গল্প: অহংকারীনি সিরি



পূর্বপাড়া গ্রামের একেবারে প্রবেশমুখেই দাঁড়িয়ে আছে এক পুরনো কাঁচাবাড়ি। সেই বাড়ির মালকিন সিঁড়ি। সিঁড়ি গ্রামের এক নামকরা দজ্জাল নারী—যা বলা যায় গ্রাম্য দুষ্টামি আর ঝগড়ার সরদার। তার রাগ, তার কথা, তার চোখের চাহনি—সবই যেন এক ধরণের ভয় আর ভক্তি মিশিয়ে তৈরি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে যতই দজ্জাল হোক না কেন, গ্রামে তার সুনামও আছে। অনেকেই বলে, "সিঁড়ি ভয়ঙ্কর বটে, কিন্তু মনের ভেতরে সে ভালো।"


সিঁড়ির একমাত্র মেয়ে ওলানা। মেয়েকে নিয়ে তার আশা ছিল অনেক। সারাদিন ঝগড়া করা, অন্যকে হেয় করা, অন্যের ভালোর ওপর হিংসা করা—এসব যতই থাকুক, ওলানার জন্য তার বুকের ভেতরটা নরম ছিল। সে ঠিক করল, "আমার মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করব। গ্রামে যারা আমার দুশমন, তাদের সামনে দেখাব—আমার মেয়ে কেমন বড়ো হবে।"


এভাবেই ওলানাকে ভর্তি করা হলো পাশের স্কুলে। স্কুলে যেতে যেতে ওলানার সঙ্গী হলো পাশের পাড়ার টুকুন। টুকুন ছিল চটপটে ছেলে, ক্লাসে ভালো পড়াশোনা করত। প্রতিদিন সাইকেলে করে ওলানাকে নিয়ে যেত স্কুলে। গল্প করত, হেসে খেলে সময় কাটত তাদের। মাঝে মাঝে টোকনের সর্দি কাশি হলে সে ওলানাদের বাড়ির উঠানে এখানে সেখানে থুথু ও কাশি ফেলত। ওলান তাকে বলতেন যেখানে সেখানে কাশি ফেলতে নেই এতে করে জীবাণু ছড়িয়ে সমস্ত এলাকার মানুষের ক্ষতি হতে পারে। 

টুকুন সেদিন বুঝেছিল যে কাশি ভয়ঙ্কর রূপে ছড়িয়ে পরতে পারে। ওলানা ছিল বুদ্ধিমতী অহংকারী। এটা টুকনের বোঝার বাকি ছিল না।


কিন্তু টুকুনের এক অদ্ভুত স্বভাব ছিল। সে মজা করতে গিয়ে এমন সব কথা বলত, যা অন্যের মনে কাঁটা বিঁধিয়ে যেত। একদিন হঠাৎ টুকুন ওলানাকে বলল,


—"দেখো ওলানা, যখন তোমার মেয়ে হবে আর পাঁচটা ছেলে হবে, তখন আমরা তাদের দিয়ে তোমার বাড়ির দরজার সিঁড়িতে পেশাব করাব। তারপর তোমার মা, মানে সিঁড়িকে দেখিয়ে হাসাহাসি করব। তখন তার অহংকার মাটিতে মিশে যাবে!"


ওলানা হতভম্ব হয়ে গেল। সে টুকুনের মুখের দিকে চেয়ে রইল। টুকুন হয়তো বুঝতেও পারল না, তার এই কথাগুলো কতটা কষ্ট দিল ওলানার মনে।


বাড়ি ফিরে ওলানা মাকে কিছুই বলল না। কিন্তু সিঁড়ির চোখ তো তীক্ষ্ণ। মেয়ের মুখের অভিমান সে টের পেল। অনেক জিজ্ঞেস করার পর ওলানা সব খুলে বলল।


সিঁড়ি প্রথমে রাগে ফেটে পড়ল। মনে হলো, এখনই ছুটে গিয়ে টুকুনকে মারধর করবে। কিন্তু হঠাৎ তার বুক কেঁপে উঠল। সে ভাবল, "আমার এত দজ্জাল স্বভাব, এত অহংকার, এত হিংসা—এসব কি টুকুনের মতো ছেলেদের মুখে আগুন হয়ে জ্বলে ওঠেনি? আমি নিজেই তো সারা জীবন অন্যকে ছোট করেছি, হাসাহাসি করেছি। আজ আমার মেয়েকে নিয়েও হাসাহাসি করছে তারা।"


সেদিন রাতে সিঁড়ি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। সে বুঝল, দজ্জালপনা দিয়ে নয়, মানুষকে সম্মান দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে সম্মান অর্জন করতে হয়।


পরদিন সকালে ওলানাকে বুকে টেনে নিয়ে সে বলল,

—"বাবা, তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো। মানুষ হও। আমার মতো ভুল করবে না। অন্যের প্রতি হিংসা নয়, বরং অন্যকে ভালোবাসা শেখো।"


সেদিন থেকেই সিঁড়ির জীবনে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। ঝগড়াটে সিঁড়ি ধীরে ধীরে শান্ত, শিক্ষিত, মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য নিবেদিত এক মায়ের রূপ পেল।



👉 নৈতিক শিক্ষা: অহংকার ও দজ্জালপনা সাময়িক সম্মান আনতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সুনাম আসে শিক্ষার মাধ্যমে এবং ভালো ব্যবহার দ্বারা।


রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 

তারিখ:০৩/১০/২০২৫

Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD.FARIDUL ISLAM  

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ