মজার গল্প : ভণ্ড কবিরাজের তাবিজ 🖋️রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🕐তারিখ:১০/১০/২০২৫

🪶মজার গল্প : ভণ্ড কবিরাজের তাবিজ
🖋️রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 
🕐তারিখ:১০/১০/২০২৫



সূর্যটা তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। গ্রামের পুকুরের ধারে নারকেল গাছের ছায়া জলের বুকে লম্বা হয়ে পড়েছে। মসজিদের মিনারে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে কানে, ঘরে ঘরে চুলা জ্বলছে, ধোঁয়ার সাথে ভেসে যাচ্ছে গ্রামের সরল মানুষের জীবনের ঘ্রাণ।
এই গ্রামেই থাকতেন জসিম উদ্দিন মিয়া — একজন পরিশ্রমী, শান্ত-স্বভাবের মানুষ। বহু বছর হলো তিনি মালয়েশিয়ায় চাকরি করেন। ঘরে রয়ে গেছে তার স্ত্রী রহিমা আর একমাত্র ছেলে রাব্বি। জসিমের পাঠানো টাকায় সংসার চলে, ঘরবাড়িও এখন পাকাঘর। গ্রামের মানুষ তাকে সম্মান করে, কারণ পরিশ্রমে সে ভাগ্য বদলেছে।

কিন্তু এই সম্মানের পেছনে জ্বলছে কিছু মানুষের ঈর্ষা—বিশেষত সেই ভণ্ড কবিরাজ কদম আলী, যিনি নিজেকে “হযরত কবিরাজ কদম শাহ” বলে পরিচয় দিতেন। তার আসল কাজ ছিল লোক ঠকানো। তাবিজ-কবজ, ঝাড়ফুঁক, জিন ধরানো—সবই তার আয়রোজগারের হাতিয়ার।

একদিন বিকেলে কদম আলী গেলেন রহিমার বাড়িতে। হাতে তেলতেলে এক থলে, গলায় জপমালা। রহিমা তখন উঠোনে বসে ছেলেকে ভাত খাওয়াচ্ছিল।

— “বউমা, সালাম আলাইকুম,” বলে এগিয়ে এলেন কদম আলী।
— “ওয়ালাইকুম সালাম, আসেন কবিরাজ ভাই, বসেন।”

তিনি গম্ভীর মুখে বসে বললেন,
— “তুমি জানো, তোমার স্বামী বিদেশে আছে। আমার কাছে খবর এসেছে, ওখানে নানান রকম মেয়েমানুষের সঙ্গে ওর উঠা-বসা...”

রহিমা হতবাক।
— “আলহামদুলিল্লাহ! আমার জসিম তো এমন না, ভাই।”

কদম আলী নিশ্বাস ফেলে বললেন,
— “তুমি সরল মানুষ, তাই বুঝো না। বিদেশের বাতাস ভালো না। আমি যদি তাবিজ না দিই, তোমার স্বামী হয়তো আর ফিরবেই না। এই তাবিজ করলে তোমার স্বামী শুধু তোমারই হবে, সারাজীবন।”

সরল রহিমা একটু ভয় পেয়ে গেল। বলল,
— “তাবিজটা কিভাবে করতে হবে?”

কদম আলী চোখে রহস্যময় ভঙ্গি এনে বলল,
— “তোমার স্বামী যখন দেশে আসবে, রাতে ঘুমালে তার দাড়ি থেকে সামান্য এক টুকরো দাড়ি ছুরি দিয়ে কেটে আমাকে দিবে। আমি তাবিজ বানাব। আল্লাহর নামে বলি, জীবনে কখনো তোমায় ছেড়ে যাবে না।”

রহিমা প্রথমে দ্বিধা করল, কিন্তু কদম আলীর মুখে এমন বিশ্বাসযোগ্য ভান যে সে শেষে রাজি হয়ে গেল।

🍌বিদেশে জসিম উদ্দিন মিয়া

ওদিকে দূরদেশ মালয়েশিয়ায়, জসিম উদ্দিন দিনরাত পরিশ্রম করত। হাতে হাতের কাটা, গায়ে ঘাম — কিন্তু মুখে হাসি। প্রতিদিন রাতে ভিডিও কলে স্ত্রীর মুখ দেখত, ছেলেকে দেখত।
একদিন সহকর্মী হাফিজ বলল,
— “ভাই, তুমি তো অনেকদিন পর দেশে যাচ্ছো। সাবধানে যেও, এখন দেশে ভণ্ড কবিরাজে ভরা।”
জসিম হেসে বলল,
— “আমার স্ত্রী তো সহজ-সরল, আল্লাহ ওকে হিদায়াত দিন।”

দু’মাস পরে ছুটি নিয়ে সে দেশে ফিরল। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি গ্রামে, কতদিন পর মাতৃভূমির মাটির গন্ধ পেয়ে বুক ভরে গেল তার।


🐸ভণ্ডের ষড়যন্ত্র

জসিম আসার খবর শুনে কদম আলী আবার সক্রিয় হলো। এবার সে গেল জসিমের কাছেও।

— “ও ভাই জসিম, তোমার বউ এখন অনেক বদলে গেছে।”
— “কী বলছো, কবিরাজ?”
— “তুমি বিদেশে থাকা অবস্থায় সে নাকি অন্য কারও সাথে ঘুরাঘুরি করে, এমনকি তোমাকে মেরে টাকা দখল করার চিন্তাও করছে!”

জসিম থমকে গেল। এমন কথা তার কানে আগে কেউ বলেনি।
কদম আলী আবার বলল,
— “আজ রাতে ঘুমিও না। আমি বলি, তোমার স্ত্রী আজ তোমাকে মারার চেষ্টা করবে। তার হাতে ছুরি থাকবে। তুমি চোখ খোলা রাখো, তাহলেই প্রমাণ পাবে।”
জসিম সন্দিহান হলেও কদম আলীর গাম্ভীর্য দেখে ভাবল—“দেখি, সত্যি কিনা!”

🍌ভয়াল রাত

সেদিন রাতে ঘরে জোছনা ঢুকেছে জানালা দিয়ে। বাতাসে পাতা নড়ে ওঠে মৃদু শব্দে। রহিমা স্বামীকে খাওয়াল, ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। এরপর কবিরাজের কথা মনে পড়ল।
মনের ভেতর ভয় আর বিশ্বাসের মিশ্র অনুভূতি। “তাবিজ করলে স্বামী আমায় ছেড়ে যাবে না”—এই ভাবনায় সে অজান্তেই পাপে জড়িয়ে পড়ছে।

রাত গভীর হলে সে উঠল নিঃশব্দে। মাটির পাতিল থেকে ছুরি বের করল। পাশে শুয়ে থাকা স্বামীর দিকে তাকাল—শান্ত মুখ, পরিশ্রমে ক্লান্ত। তবু সে ভাবে, “একটা চুলই তো কাটব, তাতে কী!”

কিন্তু ঠিক তখনই জসিম চোখ খুলে ফেলল!
— “রহিমা! তুমি এটা কী করছো?”

রহিমা আঁতকে উঠল। ছুরিটা হাত থেকে পড়ে গেল মেঝেতে।
— “না না, আমি কিছু করিনি... কবিরাজ বলেছেন তাবিজ করতে হবে...”

জসিম চিৎকার করে উঠল,
— “তাহলে সত্যিই কবিরাজ ঠিক বলেছে! তুমি আমাকে মারতে চাও!”
সেই মুহূর্তে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হলো।
রাব্বি ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠল, পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে এলো। কে ঠিক, কে ভুল—কেউ বোঝার আগেই জসিম রাগে ঘর ছেড়ে চলে গেল।

✍️পরদিন সকাল

গ্রামে হুলুস্থুল। “জসিমের বউ ছুরি হাতে ধরা পড়েছে”—এমন খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল।
কদম আলী তৃপ্তির হাসি দিল। তার উদ্দেশ্য সফল। এখন মানুষ তার “ক্ষমতা” দেখে আরও বিশ্বাস করবে—এই ভাবনায় সে গর্বে বুক ফুলিয়ে হাঁটছে।

🖋️🌺কিন্তু আল্লাহ তায়ালার বিচার অচিরেই আসে।

সেদিন বিকেলে গ্রামের মসজিদের ইমাম মাওলানা করিম সাহেব খবর পেলেন ঘটনাটা। তিনি শান্ত স্বরে সবাইকে ডাকলেন, জসিমকেও খবর পাঠালেন।
সবাই হাজির হলে তিনি বললেন,
— “ভাই জসিম, তুমি কীভাবে বিশ্বাস করলে এক ভণ্ডের কথা?”
— “হুজুর, আমি তো নিজ চোখে দেখেছি আমার স্ত্রীর হাতে ছুরি!”
— “তুমি দেখেছো ছুরি, কিন্তু শুনোনি কে তাকে বলেছে এটা করতে? সে বলেছে তাবিজ করবে যাতে তুমি তাকে ছেড়ে না যাও। সে তোমায় ভালোবেসে এমন করেছে, পাপে পড়ে গেছে ভণ্ডের প্ররোচনায়।”

রহিমা কান্নায় ভেঙে পড়ল,
— “আমি অজান্তে ভুল করেছি, হুজুর। আমি তো শুধু আমার স্বামীকে রাখতে চেয়েছিলাম।”

ইমাম সাহেব সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “ভাইয়েরা, এ আমাদের সমাজের মহা বিপদ। কদম আলীর মতো ভণ্ডেরা মানুষকে ঈমান থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর কিতাবে, কোরআনে কোথাও বলা নেই তাবিজে সুখ আসে। 
✓বরং আল্লাহ বলেন—
‘যে জিনিসের কোন জ্ঞান তোমাদের নেই, তার পেছনে চলো না।’ (সূরা ইসরা: ৩৬)।”
গ্রামের মানুষ স্তব্ধ। হুজুরের কথা কদম আলীর হৃদয়ে যেন ছুরি হয়ে বিঁধল।

💐ভণ্ডের পতন

সেদিনই মসজিদে সবাই মিলে কদম আলীকে ডেকে পাঠাল।
ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
— “তুমি কি এসব কাজ করছো?”

প্রথমে সে অস্বীকার করল। কিন্তু গ্রামের দু’তিনজন জানাল—তারা ওর কাছ থেকে “প্রেম ফিরিয়ে আনার তাবিজ”, “রোগ সারানোর পানি” ইত্যাদি নিয়েছে।
শেষে লজ্জায় কদম আলী মুখ নিচু করে বলল,
— “আমি ভুল করেছি, হুজুর। টাকার লোভে করেছি।”

ইমাম সাহেব বললেন,
— “তুমি আল্লাহর কাছে তওবা করো, আর কখনও মানুষের ঈমান নিয়ে খেলো না।”

কদম আলী কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “আল্লাহ ক্ষমা করুন। আমি আর এমন করব না।”
গ্রামবাসীও প্রতিজ্ঞা করল, আর কখনও তাবিজ-কবজে বিশ্বাস করবে না।

🪶ফের মিলন

ক’দিন পর জসিম বাড়ি ফিরল। মুখে অনুতাপ, চোখে লজ্জা।
সে রহিমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
— “আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম। তুমি আমাকে ভালোবেসে এমন কাজ করেছো, কিন্তু আমি... আমি রাগে তোমার মুখেও তাকাইনি।”

রহিমা কান্না থামিয়ে বলল,
— “ভালোবাসা যদি বিশ্বাসে না টিকে, তবে সে ভালোবাসা কেমন?”

জসিম স্ত্রীর হাত ধরল, বলল,
— “আসো, আমরা নতুন করে শুরু করি।”

সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামের আকাশে এক চিলতে রংধনু উঠেছিল—মেঘের ভেতর লুকানো সূর্যের হাসি যেন এই দম্পতির নতুন জীবনের প্রতীক।

💐শেষ কথা

এরপর থেকে গ্রামে কেউ তাবিজ-কবজের কাছে যায়নি। মসজিদে প্রতিদিন ইমাম সাহেব মানুষকে বোঝান—“বিশ্বাস রাখতে হবে আল্লাহর উপর, তাবিজের উপর নয়।”

আর কদম আলী? সে এখন ক্ষেতের কাজ করে, নামাজ পড়ে, মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছে।

জসিম ও রহিমা সুখে সংসার করে, ছেলে রাব্বি স্কুলে যায়। মাঝে মাঝে তারা পুকুরঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখে, মনে মনে ভাবে—
“একটা ভণ্ডের কথা যদি বিশ্বাস করি, জীবন ভেঙে যায়; কিন্তু আল্লাহর কথায় বিশ্বাস রাখলে সব ঠিক হয়ে যায়।”


🪶শেষ কলমে, 
✍️মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
তারিখ:১০/১০/২০২৫
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ