ছোট গল্প:জন্মের দোষ, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:১৬/১০/২০২৫
ছোট গল্প:জন্মের দোষ
(একটি সামাজিক ব্যঙ্গ-গল্প)
পাবনা জেলার কচুয়া উপজেলার পূর্ব প্রান্তে ছোট্ট একটি গ্রাম—চরকদমতলী। নদীর কোল ঘেঁষে, সবুজ ধানের শীষে ভরা মাঠের মাঝে বসে থাকা এই গ্রামটা যেন প্রকৃতির কোলে দোল খাওয়া এক শান্ত জনপদ। কিন্তু এই গ্রামের মানুষ যত শান্ত, ততই এক ব্যক্তির ভয়ে ভীত। তার নাম—কলু মাতব্বর। কিন্তু এই মতাব্বোর কখনো হার মানেনি। গ্রামের লোকেরা ভেবেছিল অবশ্যই এই অহংকারী মাতাব্বরের হার হবেই।
গ্রামের মাতব্বর বলতে যা বোঝায়, তিনি তার চেয়েও বেশি কিছু। তিনি নাকি ৪২ বছর ধরে মাতব্বরি করছেন! কথাটা তার মুখে যেন একটা মন্ত্রের মতো ঝুলে থাকে। কারও সঙ্গে কথা বললেই বলেন—
“আমি ৪২ বছর ধরে মাতব্বরি করছি। আমার কথা কেউ অমান্য করবে?”
এ কথার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে জ্বলে ওঠে দম্ভের আগুন, আর গলার সুরে ঝরে পড়ে কঠোরতার বিষ।
কলু মাতব্বরের বংশ নাকি ছিল জমিদার বংশ। তার দাদা ছিলেন গ্রামের প্রথম মাতব্বর, বাবা ছিলেন দ্বিতীয়। আর কলু এখন তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি। কিন্তু সমস্যা হলো—তিনি বংশের মর্যাদাকে মানুষের মর্যাদার ওপরে স্থান দিয়েছেন।
গ্রামের গরিব লোকজন, দিনমজুর, জেলে কিংবা কৃষক—কারও চোখে তার কৃপা নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, “বংশে যাদের কৌলিন্য আছে, তারাই মানুষ। বাকি সবাই দাস।”
যখন কোনো গরিব লোক তার সামনে ভুল করে কথা বলে ফেলে, তিনি তত্ক্ষণাত চিৎকার করেন—
> “এই! ওই বান্দির পুত! আমার সামনে কথা বলবি? তোর পাছায় লাথি মারব!”
গ্রামের লোকেরা এমন নির্যাতনকে অভ্যাস করে ফেলেছে। কেউ প্রতিবাদ করে না। কারণ, কলু মাতব্বরের একটা দল আছে—চাটুকার, লাঠিয়াল আর দালালদের দল। তারা মাতব্বরের প্রতিটি অন্যায়কে ন্যায় বলে চালিয়ে দেয়। তারাই বিভিন্ন ধরনের রুল তৈরি করে।
দিন যায়, মাস যায়, বছরও যায়।
মাতব্বরি টিকে থাকে, কিন্তু মানবতা হারিয়ে যায়।
💐দরিদ্রদের অভিশাপ
গ্রামের বৃদ্ধ লোকেরা বলত, “ওর জন্মেই দোষ আছে। ওর রক্তে অহংকার।”
কারও কারও মুখে শোনা যেত—
“ইবলীস যেমন কখনো নত হয়নি, তেমনি কলুও হবে না।”
তবু মানুষ চুপ থাকে। কারণ, গরিব মানুষের মুখে কথা থাকলেও ক্ষমতা নেই।
একদিন গ্রামের জেলে মজিদ মাছ ধরতে গিয়ে কলু মাতব্বরের ক্ষেতে ঢুকে যায়। মাতব্বর দেখে ফেলে।
“এই মজিদ! তুই আমার জমিতে পা দিস?”
মজিদ কাঁপতে কাঁপতে বলে, “মাফ কইরেন মাতব্বর, মাছটা ধইরাই ঘুরতাছিলাম।”
কিন্তু কলু রেগে আগুন।
“মাছ ধরা তোর কাজ, আমার জমিতে মাছ ধরবি না! এখনই ৫০ টাকা জরিমানা!”
মজিদের হাতে তখন এক টাকাও নেই। সে কাঁদে, মিনতি করে। কিন্তু মাতব্বরের বুক পাথর। শেষ পর্যন্ত মজিদের গলার গামছাটা খুলে নিয়ে মাতব্বর চিৎকার করে বলে—
“এটা রাখলাম আমার শাস্তি হিসেবে। গরিবের জিনিসও আমার হাতে সম্মান পায়।”গ্রামবাসী লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়।
💐একদা আলম নামে এক আলেমের আগমন
এই অন্যায়-অবিচারের মধ্যেই একদিন গ্রামে আসেন এক ব্যক্তি— মাওলানা আলম উদ্দিন । তার নজর পড়েছিল এইসব রুলস এর উপর।
তার প্রকৃত নাম আলম উদ্দিন, কিন্তু মানুষ তাকে আলম বলে ডাকে, কারণ তিনি একাই ঘুরে বেড়ান, মানুষকে উপদেশ দেন, কবিতা বলেন, কখনো গান শোনান। তার কথায় থাকে দর্শনের গভীরতা, ধর্মের আলো, আর জীবনের বেদনা।
গ্রামে এসে তিনি কলু মাতব্বরের নাম শুনে বলেন,
“চলো, দেখি এই ৪২ বছরের মাতব্বর মানুষটা কেমন।”
তিনি সরাসরি কলুর বাড়িতে হাজির হন। কলু তখন উঠানে বসে চা খাচ্ছে।
আলম সালাম দিয়ে বসেন। কলু গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করে—
“আপনি কে? আমার সামনে বসার সাহস দেখালেন?”
আলম মৃদু হাসলেন, “আমি আলম উদ্দিন। দূর গ্রাম থেকে এসেছি। শুনেছি আপনি নাকি ৪২ বছর ধরে মানুষকে বিচার দেন।”
কলুর চোখ চকচক করে উঠল।
“হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন। আমার মতো বিচারক এই অঞ্চলে নাই।” বিভিন্ন গ্রামের মাতাব্বরের আমার কাছে হার হয়ে যায় আর এই মাতাব্বরিবিদ্যা আমার সাত পুরুষের অভিজ্ঞতা।
আলম শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“তাহলে নিশ্চয়ই আপনি ন্যায়পরায়ণ?”
কলু হেসে বলল,
“ন্যায় তো শক্ত হাতে দিতে হয়। গরিবরা বুঝে না ন্যায় কী!”
আলম কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন, তারপর কবির মতো সুরে বললেন—
“সাগর ভরা জল থাকিতে চাতক পাখি পানি খায় না,
জন্মে যাহার দোষ পড়েছে, সে কখনো ভালো হয় না।”
কলুর মুখ কালো হয়ে গেল।
“এইসব কবিতা শুনতে আমার সময় নাই! আমি ন্যায় দিই, উপদেশ না।”
আলম তখন বললেন,
“আপনি হয়তো ভুলে গেছেন, বিচার যদি অহংকারে হয়, তবে তা জুলুম হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সূরা নাহল, ১৬:২৩)”
কলু তাচ্ছিল্যের হাসি দিল, “ধর্মের কথা এখন আমার কাছে আনিস না। আমিই গ্রামের আইন।” আমি যদি বলি কাজ হবে নইলে হবে না।
আলম উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
“আইন যদি আল্লাহভীতিহীন হয়, তবে তা শয়তানের আইন।”
এই কথা বলে তিনি চলে গেলেন।
গ্রামজুড়ে সেই ঘটনার গল্প ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলল, “আলম উদ্দিন সাহেব বড় মোল্লা মানুষ।” কেউ বলল, “না না, আল্লার অলি। কলু মাতব্বরের কূটজাল এবার ধ্বংস হবে।
গণু মিয়া বললেন আহারে আলম সাহেব কি কবিতা না বললেন। এতে তো আমাদের কলিজা ছিড়ে গেল।
কিন্তু আলমের কথাগুলো কলুর মনে কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
💐অহংকারের পতন
কিছুদিন পর গ্রামের জেলেরা নদীতে নতুন জাল ফেলল। এবার তারা আগে কখনো না পাওয়া পরিমাণে মাছ পেতে লাগল। গ্রামজুড়ে আনন্দের হাওয়া। সবাই বলছে, “আমাদের জাল এবার খুব ভালো হয়েছে!”
কেউ কেউ মজা করে বলে, “মাতব্বরের কূটজাল থেকে আমরা উদ্ধার পেয়েছি।”
এই কথাটা শুনে কলুর বুক কেঁপে ওঠে।
“কূটজাল”—এই শব্দটা যেন তার অহংকারে আঘাত হানে। তারাও বলে কূটজালের আজ হার হবেই।
সে ভাবতে শুরু করে, “মানুষ আমাকে ঘৃণা করে? আমি কি এত খারাপ?”
রাতে ঘুম আসে না।
একলা আলমের বলা সেই কবিতার লাইন কানে বাজতে থাকে—
“জন্মে যাহার দোষ পড়েছে, সে কখনো ভালো হয় না।”
একদিন ভোরে কলু বেরিয়ে পড়ল নদীর ধারে। সূর্যের আলো পড়েছে জলের গায়ে, মাছেরা ঝিকমিক করছে। দূরে জেলেরা হাসছে, গাইছে—
“জাল ভালো, মন ভালো, মাছও ভালো!”
কলুর বুক ভরে উঠল এক অজানা কষ্টে।
এবার শহীদ মিয়া বলে উঠলো এবার শীতে আমরা মজা পরিধান করব এবং মাপধরের কাছ থেকে দূরে থাকবো।
যেন তার কূটজালের রুল আমাদের ক্ষতি করতে না পারে অবশ্যই যারা অহংকার করে তাদের হার হবেই।
সে নিজের ৪২ বছরের মাতব্বরি চোখের সামনে দেখতে পেল—কত মানুষ কেঁদেছে, কত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে, কত মুখে অভিশাপ লেগেছে তার কারণে! এবার বলল সে কেঁদে কেঁদে আমি ভারসাম্যহীন ছিলাম আজ হার হয়ে গেল আমার এই পরাজয়ে শুধু আমি পরাজিত নই ফিরে এলো আমার বোধ শক্তি।
সে চিৎকার করে উঠল,
“আল্লাহ! আমি কী করেছি এতদিন?”
🌺অনুতাপ ও জাগরণ
এরপর কলু বদলে যেতে শুরু করল।
সে আর গরিবদের গালাগালি দেয় না। কারও কোনো সমস্যা শুনলে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু মানুষ তাকে বিশ্বাস করে না।
মজিদ একদিন বলল,
“মাতব্বর, এখন ভালো মানুষ সাজছেন? আমরা জানি, ওটা আপনার জন্মের দোষ।”
এই কথা শুনে কলুর চোখে জল চলে আসে।
সে মাটিতে বসে পড়ে বলে,
“হ্যাঁ, আমার জন্মে দোষ ছিল—অহংকারের দোষ, বংশের দোষ। কিন্তু মানুষ যদি না বদলায়, তবে সে মানুষ কেন?”
সে একলা আলমকে খুঁজে বের করল।
আলম তখন পাশের গ্রামে। কলু এসে তার পা ধরে বলল,
“আপনি ঠিক বলেছিলেন। আমি অমানুষ ছিলাম। আমার হৃদয় পাথর ছিল। আমাকে শেখান, কীভাবে মানুষ হব?”
আলম মৃদু হেসে বললেন,
“মানুষ হওয়া কঠিন নয়, কলু ভাই। শুধু মনে রাখবেন—
ক্ষমতা আল্লাহর, মর্যাদা আল্লাহর, মানুষ কেবল খিদমতগার।”সেদিন থেকে কলু মাতব্বরের পরিবর্তন শুরু হলো। শহীদ মিয়ারা বলল আসলে অহংকারী লোকদের সহজে মন পরিবর্তন হয় না কেননা এরা দরিদ্রদের দেখলেই বলে ওঠে ফকিরনিরপুত থেকে ওরা ধনী হয়েছে।
💐গ্রামের নবজাগরণ
কলু এখন আর মাতব্বরি করে না।
সে নিজের জমিতে স্কুল তৈরি করে দিল।
বলল, “গরিবের ছেলে-মেয়েরা পড়ুক, বড় হোক। শিক্ষা ছাড়া মানুষ মানুষ হয় না।”
সে নিজের বাড়ির পাশে একটা ছোট মসজিদও তৈরি করে দিল, যেখানে সে প্রতিদিন নামাজ পড়ে।
প্রতি জুমার দিনে সে গ্রামবাসীর সামনে দাঁড়িয়ে বলে—
> “ভাইসব, আমি একসময় অন্ধ ছিলাম। অহংকারের নেশায় ডুবে গিয়েছিলাম। এখন বুঝি—
জন্মের দোষ বলে কিছু নেই, মানুষই নিজের দোষ তৈরি করে।”
গ্রামজুড়ে ধীরে ধীরে বদল আসে।
যারা আগে অন্যায়ে নত হতো, তারা এখন সত্য বলার সাহস পায়।
মজিদ মাছ ধরে, হাসে, কলুর সঙ্গে মসজিদে বসে চা খায়।
একদিন একলা আলম আবার ফিরে এলেন।
গ্রাম দেখে হাসলেন—
“এবার তো জালটা সত্যিই ভালো হয়েছে, কলু ভাই!”
কলু মাথা নিচু করে বলল,
> “হ্যাঁ আলম সাহেব, এবার কূটজাল ছিঁড়ে ফেলেছি। এবার শুধু মানুষের জাল।”
আলম মৃদু কণ্ঠে বললেন,
“আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সেইসব মানুষের তাওবা কবুল করেন, যারা অজ্ঞতাবশত অন্যায় করে, পরে দ্রুত তাওবা করে।’ (সূরা নিসা, ৪:১৭)”
কলুর চোখ ভিজে উঠল।
💐শেষ দৃশ্য
বছর দু’পর কলু বৃদ্ধ হলো।
এক সন্ধ্যায় গ্রামের মসজিদের পাশেই সে বসে আছে। সূর্য ডুবছে, আকাশে সোনালি রং।
সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলে—
“আমি একসময় ভাবতাম, জন্মের দোষ মানেই শেষ। কিন্তু এখন বুঝি, মানুষ চাইলেই নতুন জন্ম নিতে পারে—তাওবার জন্ম, বিনয়ের জন্ম।”
সেদিন রাতে শান্ত ঘুমে তার মৃত্যু হয়।
গ্রামবাসী জানাজায় ভিড় করে। কেউ বলে,
“মাতব্বর ছিল খারাপ, কিন্তু শেষ জীবনে ফেরেশতা হয়ে গেল।”
একলা আলম জানাজার পাশে দাঁড়িয়ে বলেন—
“কলু শিখেছে, যে মানুষ নিজের দোষ চিনতে পারে, সে-ই আসল মানুষ। জন্মের দোষ নয়, জীবনের তাওবা-ই মানুষের পরিচয়।”
✓গল্পের শিক্ষা
অহংকার মানুষকে ইবলিসের মতো পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
ক্ষমতা, বংশ, সম্পদ—এসব কেবল পরীক্ষার মাধ্যম।
যে বিনয় শেখে, সে আল্লাহর প্রিয় বান্দা;
আর যে অহংকারে অন্ধ হয়, সে নিজের জন্মকেই অভিশাপ বানায়।
তাই, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা বংশে নয়—আচরণে, বিনয়ে, ও আল্লাহভীতিতে। শহীদ মিয়া এবার বুঝতে পারলো অহংকার আসলে ইবলিশের জন্মের দোষ তাই সে কলু মাতব্বরের মতো নিজেও তওবা করলো। এবং আল্লাহর কাছে বলল যেন আমি কলু মাতব্বরের মত কখনো চক্রান্তের কূটজালে পড়ে অহংকার না করি যদিও আমি দরিদ্র।
✍️শেষ কলমে,
মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।
তারিখ:১৬/১০/২০২৫
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL ISLAM.
😝🌵🔩🔑❌



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন