প্রবন্ধ: রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাণী আমার উম্মতের একশ্রেণী মূর্তিপূজকদের সাথে লিপ্ত হবে। রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:২/১০/২০২৫

 প্রবন্ধ: রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাণী আমার উম্মতের একশ্রেণী মূর্তিপূজকদের সাথে লিপ্ত হবে।


হাদীস শরীফ:

‎حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عِيسَى، قَالاَ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَبِي أَسْمَاءَ، عَنْ ثَوْبَانَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِيَ الأَرْضَ ‏"‏ ‏.‏ أَوْ قَالَ ‏"‏ إِنَّ رَبِّي زَوَى لِيَ الأَرْضَ فَرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا وَإِنَّ مُلْكَ أُمَّتِي سَيَبْلُغُ مَا زُوِيَ لِي مِنْهَا وَأُعْطِيتُ الْكَنْزَيْنِ الأَحْمَرَ وَالأَبْيَضَ وَإِنِّي سَأَلْتُ رَبِّي لأُمَّتِي أَنْ لاَ يُهْلِكَهَا بِسَنَةٍ بِعَامَّةٍ وَلاَ يُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنْفُسِهِمْ فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ وَإِنَّ رَبِّي قَالَ لِي يَا مُحَمَّدُ إِنِّي إِذَا قَضَيْتُ قَضَاءً فَإِنَّهُ لاَ يُرَدُّ وَلاَ أُهْلِكُهُمْ بِسَنَةٍ بِعَامَّةٍ وَلاَ أُسَلِّطُ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ سِوَى أَنْفُسِهِمْ فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ وَلَوِ اجْتَمَعَ عَلَيْهِمْ مَنْ بَيْنَ أَقْطَارِهَا أَوْ قَالَ بِأَقْطَارِهَا حَتَّى يَكُونَ بَعْضُهُمْ يُهْلِكُ بَعْضًا وَحَتَّى يَكُونَ بَعْضُهُمْ يَسْبِي بَعْضًا وَإِنَّمَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي الأَئِمَّةَ الْمُضِلِّينَ وَإِذَا وُضِعَ السَّيْفُ فِي أُمَّتِي لَمْ يُرْفَعْ عَنْهَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَلاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ وَحَتَّى تَعْبُدَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي الأَوْثَانَ وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي كَذَّابُونَ ثَلاَثُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لاَ نَبِيَّ بَعْدِي وَلاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ ابْنُ عِيسَى ‏"‏ ظَاهِرِينَ ‏"‏ ‏.‏ ثُمَّ اتَّفَقَا ‏"‏ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ ‏"‏ ‏.


সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ


তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ (অথবা) আমার রব পৃথিবীকে আমার জন্য সংকুচিত করে দিয়েছেন এবং আমাকে এর পূর্ব ও পশ্চিম সীমানা দেখানো হয়েছে। আর যতটুকু আমার জন্য সংকুচিত করা হয়েছে, ততটুকুতে অচিরেই আমার উম্মাতের রাজত্ব বিস্তার লাভ করবে। আমাকে লাল ও সাদা (স্বর্ণ ও রূপার) দু’টি ধনভান্ডার দেয়া হয়েছে। আর আমি আমার মহান প্রতিপালকের নিকট আমার উম্মাতের জন্য এই কথার আবেদন করেছি যে, তিনি তাদের সবাইকে যেন দুর্ভিক্ষে ধ্বংস না করেন এবং তাদের নিজেদের ব্যতীত কোন শত্রু যেন তাদের উপর কর্তৃত্ব করতে না পারে যারা তাদের ধ্বংস করে দিবে। নিশ্চয়ই আমার রব আমাকে বলেছেন, হে মুহাম্মাদ! আমি যা ফায়সালা করি, তা বাতিল হয় না। তবে আমি তাদের সবাইকে একসঙ্গে দূর্ভিক্ষে ধ্বংস করবো না এবং তাদের নিজেদের ছাড়া দিগ্বিদিক হতে আগত তাদের সমূলে বিনাশকারী বিধর্মী শত্রুকে তাদের উপর কর্তৃত্ব করতে দিবো না, তবে তাদের কতক অপরদের ধ্বংস করবে এবং কতক অপরাধে বন্দী করবে। আর আমি আমার উম্মাতের পথভ্রষ্ট নেতাদের ব্যাপারে শঙ্কিত। আমার উম্মাত যখন পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তখন ক্বিয়ামাত সংঘটিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা বিরত হবে না। আর আমার উম্মাতের কিছু সংখ্যক মুশরিকদের সঙ্গে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত এবং আমার উম্মাতের কতিপয় গোত্র মূর্তি পূজায় লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ক্বিয়ামাত সংঘটিত হবে না। অবিলম্বে আমার উম্মাতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব ঘটবে, তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবী করবে। অথচ আমিই সর্বশেষ নবী এবং আমার পরে আর কোন নবী আসবে না। তবে আমার উম্মাতের একটি দল সর্বদা সত্যের উপর অটল থাকবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে, তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না, এমনকি এ অবস্থায় আল্লাহ্‌র নির্দেশ (ক্বিয়ামাত) এসে যাবে।

সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪২৫২

হাদিসের মান: সহিহ হাদিস


হাদীসের বিশদ ব্যাখ্যা


১. পৃথিবীকে “গুটিয়ে দেখানো” শিক্ষা


রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমার জন্য পৃথিবীকে গুটিয়ে দেখানো হলো।”

অলৌকিক দৃষ্টি: এটি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার সাক্ষ্য। সাধারণ মানুষ পুরো পৃথিবীকে একসাথে দেখতে পারে না, কিন্তু নবী সা. এই বিশেষ জ্ঞান পান।

উম্মতের প্রতি দায়িত্বের উপলব্ধি: নবী সা. পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ও জাতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, যা উম্মতের কল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আধ্যাত্মিক শিক্ষা: পৃথিবীকে গুটিয়ে দেখার অর্থ হলো বিশ্ব ও সৃষ্টির গভীর বাস্তবতা উপলব্ধি করা।


২. সোনা ও রূপার ভাণ্ডার

"আমাকে লাল ও সাদা রঙের দু’টি ধনভাণ্ডার—অর্থাৎ সোনা ও রূপা—দেওয়া হয়েছে।"

আর্থিক শিক্ষা: সম্পদ মানুষের জন্য নয়, বরং আল্লাহ প্রদত্ত এবং এটি ন্যায়পরায়ণভাবে ব্যবহার করা উচিত।

প্রতীকী শিক্ষা: সম্পদ মানে ক্ষমতা, কিন্তু নবী সা. এই ক্ষমতাকে উম্মতের কল্যাণে ব্যবহার করেছেন।


৩. উম্মতের জন্য তিনটি বিশেষ প্রার্থনা


নবী সা. তিনটি প্রার্থনা করেছেন:

1. উম্মতকে দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হতে রক্ষা করা।

2. উম্মতের মধ্যে দলে বিভক্তি ও সহিংসতা না ঘটানো।

3. আল্লাহর ফয়সালা স্থায়ী রাখা।

শিক্ষা: নবী সা. উম্মতের কল্যাণের জন্য আন্তরিক প্রার্থনা করেছেন এবং নেতৃত্বের ন্যায়পরায়ণতার উদাহরণ স্থাপন করেছেন।


৪. সশস্ত্র সংঘাত ও বিপদ

"যদি উম্মতের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়, কিয়ামত পর্যন্ত অস্ত্রবিরতি হবে না।"

এটি সতর্কবার্তা যে পৃথিবীতে যুদ্ধ ও সংঘাত চিরস্থায়ী বিপদ।

তবে আল্লাহ সত্যের পথে থাকা দলকে সাহায্য করবেন।


৫. পথভ্রষ্ট নেতা ও মিথ্যাবাদী দাজ্জাল

নবী সা. বলেন, "আমি আমার উম্মতের জন্য সবচেয়ে ভয় পাচ্ছি পথভ্রষ্ট নেতাদের।"

কিছু গোত্র প্রতিমা পূজা ও মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দেবে।

কিয়ামতের সময় ৩০ জন মিথ্যাবাদী দাজ্জাল আবির্ভূত হবে।

শিক্ষা: উম্মতের সতর্কতা ও সঠিক পথের ওপর স্থির থাকা অপরিহার্য।


৬. সত্যের দল সর্বদা জয়ী

"আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।"

আল্লাহর সহায়তায় সত্যপরায়ণরা সব বিপদ ও মিথ্যাবাদীর মোকাবিলা করতে সক্ষম।


শিক্ষণীয় মূলবিন্দু


1. উম্মতের প্রতি নবীর গভীর দায়িত্ব ও সহানুভূতি।

2. পৃথিবী ও সম্পদের সত্যিকারের মালিক আল্লাহ।

3. সংঘাত, দুর্ভিক্ষ ও পথভ্রষ্ট নেতাদের সতর্কবার্তা।

4. সত্যের পথে দৃঢ় থাকা সর্বদা বিজয়ী।

5. নবীর প্রার্থনা ও ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্ব উম্মতের জন্য চিরন্তন শিক্ষা।


সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ, রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মিথ্যাবাদী নেতার প্রভাব প্রকট। এই হাদীস আমাদের শিক্ষা দেয় যে:

নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব: সত্যের পথে দৃঢ় থাকা অপরিহার্য।

উম্মতের সংহতি রক্ষা: বিভাজন ও সংঘাত এড়াতে সদা সচেতন থাকা।

আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা: আল্লাহই সর্বশেষ সাহায্যকারী।


উপসংহার


হাদীসটি আমাদের দেখায় যে নবী সা. শুধুমাত্র ভবিষ্যৎবাণী করেননি, বরং উম্মতের জন্য গভীর প্রার্থনা ও নৈতিক দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন।

সত্যের পথের প্রতি দৃঢ় থাকা এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করা সর্বদা বিজয়ী।

দুনিয়ার শক্তি ও সম্পদ শুধুমাত্র ন্যায়পরায়ণতার জন্য ব্যবহৃত হতে হবে।

সত্য ও সহানুভূতির ভিত্তিতে নেতৃত্ব গ্রহণই উম্মতের কল্যাণ নিশ্চিত করবে।


শেষ কলমে, 

মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম

Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.



মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ