মজার গল্প: ইসমাইলের রোল নম্বর( রসাত্নবোধক), রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:১৩/১০/২০২৫

 মজার গল্প: ইসমাইলের রোল নম্বর( রসাত্নবোধক)

বাংলার এক ছোট্ট গ্রাম— নাম তার চাঁদপুরা। গ্রামের চারপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত, বাঁশঝাড়, পুকুরের নীল জল, আর দূরে হেলেদুলে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ। সকাল হলে মুরগির ডাক আর আজানের ধ্বনি মিলেমিশে এক সুর তোলে, যেন প্রকৃতিরই তসবিহ বয়ে যায় চারদিকে।

এই গ্রামেই বাস করত এক ছোট্ট ছেলেটি— নাম তার ইসমাইল। তার চোখ দু’টো কালো , আর মুখে সবসময় এক চিলতে হাসি। স্কুলে সে ছিল অত্যন্ত মেধাবী। শিক্ষকরা তাকে বলতেন, “ইসমাইল, তুই যে মাথা খাটাস, তাতে ভবিষ্যতে অনেক বড় কিছু হতে পারবি।”

ইসমাইলের বাবা ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। নাম আব্দুল গফুর। সারা দিন মাঠে কাজ করতেন, কিন্তু সন্ধ্যা হলে ছেলেকে কোরআন শেখাতে নিয়ে যেতেন গ্রামের হাফেজ সাহেবের কাছে। মা আমেনা খাতুন ছিলেন পরহেজগার নারী, ছেলেকে বারবার বলতেন—
“বাবা, মানুষ বড় হইলে শুধু বইয়ের বিদ্যা না, মনুষ্যত্বের বিদ্যাও শিখতে হয়।”

ইসমাইল এসব কথা মনে রাখত। তাই সে যেমন পড়াশোনায় ভালো, তেমনই ভদ্র, সহানুভূতিশীল আর রসিক ছিল। তার রসবোধ এমন যে, সবাই হাসতে হাসতে মুগ্ধ হয়ে যেত।

🍌১. স্কুলের গল্প

চাঁদপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস চলত গ্রামের পুরনো টিনের ঘরে। এক পাশে মাঠ, আরেক পাশে পুকুর। ক্লাসের বেঞ্চগুলো কিছু কাঠের, কিছু স্টিলের। কিন্তু তবু সেখানে প্রাণ ছিল, হাসি ছিল।

ইসমাইল ছিল তৃতীয় শ্রেণীতে, আর গ্রামের কিছু বড় ছেলে— সাইফুল আর কামাল— ছিল পঞ্চম শ্রেণীতে। তারা দু’জন একটু দুষ্টু প্রকৃতির। সবসময় নিচের ক্লাসের ছোটদের নিয়ে হাসাহাসি করত।

একদিন দুপুরে ক্লাসের ফাঁকে তারা এসে ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে মজা করে বলল—
“এই ইসমাইল, শুনলাম তোর রোল নম্বর দুই!”
ইসমাইল একটু হেসে বলল, “হ্যাঁ, তাই তো।”
সাইফুল হেসে বলল, “আমাদের  রোল এক! মানে তুই আমাদের মতো এক হইছিস নাকি?”

ইসমাইল হেসে বলল, “না না, মনে হয় রোল এক হইলেই বড় কিছু হয় না। কিন্তু তুই ছোট ক্লাসে পড়ে রোল দুই! এটা কেমন করে হয়?”

সবাই হাসতে লাগল। ক্লাসের কিছু ছোট ছাত্রও গাল টিপে হেসে ফেলল।

ইসমাইল বুঝল, তারা আসলে তাকে খোঁচা দিচ্ছে। কিন্তু সে চুপ করে না থেকে, নিজের ভেতরের বুদ্ধিটা কাজে লাগাল।
সে বলল যে হিজড়াদের কোন উল থাকে না কিন্তু যারা পুরুষ তাদের উলের গোটা দুইটাই হয়। তখন সবাই চুপ হয়ে গেল।
এরপর সে আবার বলল, ধীরভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভাইরা, তোমরা আমার রোল নিয়ে হাসছো, কিন্তু একটা কথা মনে রাখো— রোল নম্বর তো কেবল একটা সংখ্যা। আসল রোল হলো, কে কতটা মানুষ হতে পারে।”

সবাই চুপ। তারপর ইসমাইল একটু রসিক ভঙ্গিতে যোগ করল,
“আর একটা কথা মনে রেখো, শিক্ষক বলেছেন— রোল দুই মানে সবসময় দ্বিতীয় নয়, বরং সেরা দু’জনের মধ্যে একজন!”

শ্রেণীকক্ষ হাসিতে ফেটে পড়ল। এমন বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর শুনে এমনকি শিক্ষক মজিদ স্যারও হাসলেন। তিনি বললেন,
“বাহ! ইসমাইলের উত্তর সত্যিই বুদ্ধির পরিচয় দেয়। সবাইকে এভাবে কথা বলতে শেখা উচিত— যেন কথায় কেউ আহত না হয়, আবার শিক্ষা পায়।”

২. গ্রামের পরিবেশ ও মানুষের ভালোবাসা

চাঁদপুরা ছিল সেই ধরনের গ্রাম, যেখানে সকালের কুয়াশায় ঢেকে থাকে পথ, আর বিকেলে মাঠে খেলে শিশুদের দল। কেউ ছাগল চরায়, কেউ মাছ ধরে, কেউ আবার স্কুল শেষে বন্ধুদের সঙ্গে গাছের ছায়ায় গল্প করে।

ইসমাইলের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা ছিল গ্রামের বড় পুকুরের পাড়ে একটা আমগাছের নিচে। সেখানে বসে সে বই পড়ত, আবার বন্ধুদের পড়া বুঝিয়ে দিত। তার এক বন্ধু, রফিক, একদিন বলল—
“ইসমাইল, তুই না থাকলে আমরা অঙ্ক শিখতেই পারতাম না।”
ইসমাইল মুচকি হেসে বলেছিল, “জ্ঞান ভাগ করলে কমে না, বরং বাড়ে।”

এই কথাটা পরে পুরো গ্রামের মুখে মুখে ফিরেছিল। এমনকি গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবও এক খুতবায় বলেছিলেন—
“দেখো, ছোট ইসমাইল কত সুন্দর কথা বলে। জ্ঞান আর নৈতিকতা একসাথে থাকলে মানুষ বড় হয়।”

💐 ৩. বন্ধুত্বের পরীক্ষা

কিন্তু সেই সাইফুল আর কামাল ইসমাইলের বুদ্ধি দেখে একটু ঈর্ষান্বিত হলো। তারা ভেবেছিল, “ছোট একটা ছেলের এত নাম কেন হবে?”

একদিন তারা আবার সুযোগ পেল মজা করার। স্কুলে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে— কোরআন তিলাওয়াত, কবিতা আবৃত্তি আর নাটক। ইসমাইলকেও অংশ নিতে বলা হলো। সে অংশ নিল কোরআন তিলাওয়াতে।

অনুষ্ঠানের দিন সকালে তারা ইসমাইলকে বলল—
“এই ইসমাইল, তুই এত নাম করলি, কিন্তু দেখিস, তোর তিলাওয়াতে কেউ হাততালি দিবে না। কারণ তুই ছোট।”

ইসমাইল হেসে বলল, “ছোট-বড় আল্লাহর কাছে নয়, মানুষের কাছে। আর প্রশংসা যদি পাওয়া যায় মানুষের থেকে, তবে চেষ্টা করবো সেটা যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম হয়।”

সেদিন বিকেলে যখন ইসমাইল তিলাওয়াত করল, তার কণ্ঠে এমন মিষ্টি সুর ও শ্রদ্ধা ছিল যে, সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। অনুষ্ঠান শেষে প্রধান শিক্ষক নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—
“এই ছেলেটির কণ্ঠে শুধু তিলাওয়াত নয়, আছে ঈমানের মাধুর্য।”

সাইফুল আর কামাল মাথা নিচু করে বসে রইল। তারা বুঝল, যার হৃদয় পরিশুদ্ধ, তার মুখের কথা নিজে থেকেই প্রভাব ফেলে। ইসমাইল এবার পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পেল এবং তাক লাগিয়ে দিল সকল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যাদের রুল এক ছিল কিন্তু তারা করতে পারল না।
আল্লাহর কুদরতে সে এগিয়ে যেতে লাগলো জীবনের লক্ষ্যপথে।

৪. নৈতিক জবাব

একদিন ক্লাস শেষে তারা আবার ইসমাইলকে মজা করে বলল,
“তুই বড় বুদ্ধিমান হইছিস, কিন্তু মনে রাখ, আমাদের রোল এক, তোর দুই। তাহলে আমরা তোর চেয়ে এগিয়ে।”

ইসমাইল এবার হাসল, কিন্তু তার চোখে মমতা। সে বলল,
“না ভাই, রোল নম্বর যা হোক দায়িত্ব এক নয়। তোমরা বড়, তোমাদের দায়িত্বও বড়। বড় ভাই হইয়া ছোটদের সম্মান করা শেখো। বড় হইলে অহংকার না, দায়িত্ব বাড়ে।”

এই কথা শুনে শিক্ষক মজিদ স্যার, যিনি দূর থেকে সব শুনছিলেন, এগিয়ে এসে বললেন—
“তোমাদের ক্লাসে আজ আমি সবচেয়ে বড় শিক্ষা পেলাম। জ্ঞানের সঙ্গে যদি নৈতিকতা না থাকে, তাহলে সে জ্ঞান অন্ধকার। ইসমাইল, তুই আল্লাহর দান।”

সেদিন সাইফুল আর কামাল লজ্জায় মাথা নিচু করল, কিন্তু ইসমাইল তাদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“চল, আমরা একসাথে পড়াশোনা করব। আমি তোমাদের সাহায্য করব, তোমরাও আমাকে শেখাবে।”

সেই দিন থেকেই তিনজনের বন্ধুত্ব নতুন করে গড়ে উঠল— মজবুত, আন্তরিক ও সত্যিকারের।

🍌 ৫. গ্রামের পরিবর্তন

সময় গড়াল। গ্রামের মানুষ এখন ইসমাইলকে “ছোট মাওলানা” বলে ডাকে। সে শুধু স্কুলে নয়, মসজিদে, বাড়িতে, এমনকি পুকুরপাড়ে বসে ছোটদের কুরআনের গল্প শোনায়।

একদিন সে ছোটদের বলল—
“মানুষকে ছোট করে হাসলে, নিজেকে ছোট করা হয়। আর কাউকে সম্মান দিলে, নিজের মর্যাদা বাড়ে।”

তার কথাগুলো গ্রামের প্রবীণরাও মন দিয়ে শুনতেন।
বৃদ্ধ হাজি করিম সাহেব বলেছিলেন,
“ছেলেটার মুখে যেন আল্লাহ তায়ালার নূর আছে। এমন সন্তানই একদিন গ্রামকে আলোকিত করে।”

🪶৬. ইসমাইলের স্বপ্ন

ইসমাইল স্বপ্ন দেখত, একদিন সে বড় হয়ে শিক্ষক হবে। তার বাবা-মা তাকে দোয়া করতেন, “আল্লাহ তোর মুখ উজ্জ্বল করুক।”

একদিন বিকেলে আমগাছের নিচে বসে রফিক জিজ্ঞেস করল,
“ইসমাইল, তুই কেমন শিক্ষক হতে চাস?”
সে হেসে বলল,
“যে ছাত্রদের শুধু পড়া শেখাবে না, মানুষ হওয়াও শেখাবে।”
তার সেই কথাগুলো যেন বাতাসে মিলিয়ে গেলেও, গ্রামের মানুষের হৃদয়ে রয়ে গেল চিরকাল।

🪷৭. সমাপ্তি ও নৈতিক শিক্ষা

বছর ঘুরে ইসমাইল পঞ্চম শ্রেণীতে উঠল। এখন তার রোল নম্বর ছিল না “দুই”, বরং “এক”। কিন্তু তাতে সে কোনো গর্ব অনুভব করল না। সে বলল,
“রোল নম্বর পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু নীতিবোধ যেন কখনো না বদলায়।”

শিক্ষক মজিদ স্যার তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“বাবা, তুই যে শিক্ষা দিলি আমাদের সবাইকে— তা কোনো বইয়ে লেখা নেই। জ্ঞান, রসবোধ আর নৈতিকতা যদি একসাথে থাকে, তবেই মানুষ প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়।”

ইসমাইল মৃদু হাসল। তার চোখে তখন গ্রামের আলো ঝলমল করছে— যেন প্রকৃতির প্রতিটি রঙ তার হৃদয়ে মিশে গেছে।

সেদিন বিকেলের সূর্য যখন গাছের ফাঁক দিয়ে আলো ফেলছিল, ইসমাইল তার বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোমরা জানো, আমি একদিন ভেবেছিলাম, বড় মানে রোল এক। এখন বুঝেছি, বড় মানে মন বড়। কেউ হাসলে হাসি, কেউ কাঁদলে পাশে দাঁড়ানো— এইটাই বড় হওয়া।”

বন্ধুরা চুপ করে শুনল, তারপর তিনজন একসাথে হাঁটতে লাগল গ্রামের মাটির পথ ধরে। বাতাসে ধানের গন্ধ, দূরে আজানের ধ্বনি, আর আকাশে সূর্যাস্তের রঙে ভরে গেল চাঁদপুরা গ্রাম।

নৈতিক শিক্ষা:
জীবনে রোল নম্বর বা অবস্থান নয়, আসল গুরুত্ব মনুষ্যত্বের।
যে মানুষ জ্ঞান, রসবোধ ও নৈতিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অন্যের হৃদয় জয় করতে পারে, তারই নাম প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ।

শেষ কলমে,
মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম।
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ