শিরোনাম: দয়ার ছোঁয়া, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
শিরোনাম: দয়ার ছোঁয়া
গ্রামের নাম সিরাজগঞ্জের তারাশ। সবুজে ঘেরা এই ছোট্ট গ্রামে বসবাস করেন মাওলানা ইউনুছ উদ্দিন। মাদরাসার শিক্ষক, সবার প্রিয় মানুষ। মাথায় সাদা টুপি, হাতে তসবিহ, মুখে সর্বদা হাসি। তার স্ত্রী সালমা খাতুন—একজন পরহেজগার নারী। ঘরে একমাত্র সন্তান—ছোট্ট রায়হান। বয়স মাত্র চার বছর। গোল মুখ, টুকটুকে গাল, চোখে কৌতূহলের ঝিলিক।
প্রতিদিন সকালে মাওলানা সাহেব মসজিদে নামাজ পড়াতে যান। তারপর মাদরাসায় পাঠদান করেন। বিকেলে ফিরে এসে উঠোনে বসে চা খান, পাশে ছোট্ট রায়হান দৌড়ে আসে—
“আব্বা! দেখেন আমি আজ কত বড় আয়াত মুখস্থ কইরা ফেলছি!”
মাওলানা সাহেব হেসে বলেন,
“মাশাআল্লাহ! আমার রায়হান তো দিন দিন হাফেজ হয়ে যাইতাছে!”
তারপর তিনি শিশুটিকে কোলে তুলে নেন, কপালে চুমু খান।
সালমা খাতুন পাশ থেকে হাসেন,
“এই যে রায়হান, আব্বা আসলে আর কই গিয়া লুকায়! সারাক্ষণ কোলে চায়।”
গ্রামের মানুষরা মাওলানা সাহেবকে শ্রদ্ধা করলেও, অনেক সময় কেউ কেউ অবাক হত তার এই শিশুর প্রতি অগাধ ভালোবাসা দেখে। একদিন বিকেলে পাশের বাড়ির আব্দুল হাকিম মোল্লা এসে বললেন,
“হুজুর, আপনে তো মাদরাসার শিক্ষক, আবার শিশুটা বড় হইছে—এইভাবে কোলে নেয়া, চুমা দেয়া কি দরকার?”
মাওলানা ইউনুছ উদ্দিন মৃদু হাসলেন, তারপর ধীরে বললেন,
“ভাই হাকিম, শুনছেন একটা হাদীস?”
তিনি নিচু কণ্ঠে পাঠ করতে লাগলেন:
‘جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ...’
তারপর বললেন,
“একজন বেদুইন নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে বলেছিল—আপনারা কি শিশুদের চুমা দেন? আমরা তো দিই না। তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া তুলে নেন, তবে আমি কী করতে পারি?’—এই হাদীস আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে, ভাই।”
আব্দুল হাকিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
“হুজুর, ঠিকই কইছেন। আমরা গ্রামের লোক, অনেক সময় ভালোবাসা প্রকাশ কইরা দেখি না। কিন্তু ভালোবাসার জায়গাটা যদি শুকায়, দয়া-দরদও শেষ হইয়া যায়।”
সেই রাতে মাওলানা সাহেব মাগরিবের পর রায়হানকে কোলে নিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করাচ্ছিলেন। শিশুটি ছোট্ট কণ্ঠে বলছিল,
“বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম... আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন...”
শব্দগুলো উঠোন জুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। মা সালমা পর্দার আড়াল থেকে দেখছিলেন, চোখে আনন্দের অশ্রু। তিনি ভাবলেন, “যে বাবা আল্লাহর রাসূলের দয়ার শিক্ষা নিজের সন্তানে প্রয়োগ করে, সে তো আসলেই আশীর্বাদপ্রাপ্ত।”
একদিন গ্রামের মসজিদে শিশুদের কিরাত প্রতিযোগিতা হলো। রায়হানও অংশ নিল। ছোট্ট গলায় সুন্দরভাবে সূরা ইয়াসিনের আয়াত তেলাওয়াত করল। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। শেষে সে প্রথম হলো। মাওলানা সাহেব মঞ্চে গিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিলেন, সবাই দেখল—তিনি সন্তানের কপালে চুমু দিচ্ছেন।
বৃদ্ধ মাওলানা করিম, যিনি আগে এসবকে “অতিরিক্ত মায়া” ভাবতেন, তাকিয়ে বললেন,
“আহা! এই ভালোবাসাই তো আমাদের সমাজে দরকার, যেইটা নবীজি (সা.) আমাদের শেখাইয়া গেছেন।”
রাতে ঘরে ফিরে সালমা বললেন,
“আজ রায়হানকে কোলে তুলছেন দেখে সবাই কত খুশি!”
মাওলানা ইউনুছ মৃদু হেসে বললেন,
“সন্তানকে ভালোবাসা মানে শুধু স্নেহ নয়—এটা দয়া, রহমত, নবীর সুন্নত। যেই ঘরে ভালোবাসা থাকে, সেখানে শয়তানের জায়গা হয় না।”
বছর ঘুরে যায়। রায়হান স্কুলে ভর্তি হয়। একদিন স্কুল থেকে ফিরে বলে,
“আব্বা, আজ আমি এক বন্ধুরে কাঁদতে দেখছি। তারে মা-বাবা বকতেছে। আমি তারে বলছি—তুমি ভয় পেও না, নবীজি (সা.) কইছিলেন, শিশুদের প্রতি দয়া করো।”
মাওলানা সাহেব ছেলেকে কোলে নিয়ে চুমু খেলেন। তার চোখে অশ্রু। তিনি ভাবলেন—
“নবীজি (সা.)-এর সেই হাদীস আজ আমার সন্তানের মুখে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।”
গ্রামের মানুষের চোখে ইউনুস উদ্দিন সাহেবের ঘর যেন দয়ার প্রতীক হয়ে দাঁড়াল। সবাই বলত—
“যে ঘরে শিশুর হাসি, দোয়া, আর দয়া আছে—সেই ঘরই জান্নাতের ছায়া।”
নৈতিক শিক্ষা:
দয়া ও ভালোবাসা মানুষকে মানুষ করে তোলে। শিশুদের প্রতি মমতা শুধু আবেগ নয়, এটি এক মহান সুন্নত। যে হৃদয়ে ভালোবাসা নেই, সেখানে রহমতের নূরও প্রবেশ করে না।
🍌আদাবুল মুফরাদ-৮৯
শেষ কলমে,
🍌 মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম ✍️
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন