ছোট গল্প:ওয়াজ খালপাড়ে রেখে আসা, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:১৪/১০/২০২৪
ছোট গল্প:ওয়াজ খালপাড়ে রেখে আসা
গ্রামের নাম কচুয়া। একেবারে নদীর তীর ঘেঁষা গ্রাম। বাঁশঝাড়, খেজুরগাছ, কাঁচা রাস্তা—সব মিলিয়ে একেবারে গ্রামীণ সৌন্দর্যের ছোঁয়া। শীতের এক বিকেলে মসজিদের পাশে প্যান্ডেল বাঁধা হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ জড়ো হয়েছে এক নামী ওয়াজিনের ওয়াজ শুনতে।
নানা চটকু সাহেব গ্রামের বেশ প্রাজ্ঞ ও ধার্মিক মানুষ। মাথায় টাক, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধে চাদর। তার পাশে বসেছে নাতি রাফি—নবম শ্রেণির ছাত্র। শহরে পড়ে, কিন্তু ছুটিতে গ্রামে এসে নানা-নানির সঙ্গে থাকে।
ওয়াজ শুরু হলো। বক্তা একের পর এক বিষয় তুললেন—নামাজ, রোযা, আমানতদারিতা, গীবত, অহংকার, দুনিয়ার মোহ। বক্তা বললেন,
> “ভাইসব! ইসলামে লজ্জাশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যে লজ্জাশীল নয়, সে ঈমানদার নয়। তাই লজ্জার অজুহাতে কাপড় ছোট করা বা অঙ্গ প্রকাশ করা হারাম। পুরুষের জন্য নাভির নিচ থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢেকে রাখা ফরজ।”
ওয়াজ শেষ হলে রাফি নানা-নাতির দু’জনেই বেশ ভাবনায় পড়ল। নানা বললেন,
—দেখছ রাফি, কী সুন্দর বুঝাইলো হুজুর! মানুষ যদি এই কথাগুলা আমলে আনে, দুনিয়া বদলাই যাইতো।
রাফি মাথা নাড়ল—
—ঠিকই কইছো নানা।
তারপর দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে ফেরার পথে এল খালের ধারে। খালটা ছোট হলেও তখন বর্ষার পানি টলটল করছে। যে বাঁশের সাঁকোটা ছিল, সেটা ভেসে গেছে স্রোতে।
নানা একটু তাকিয়ে বললেন,
—রাফি, দেখি খালটা তেমন গভীর না। আমি পার হই, তুই পিছে আয়।
এ কথা বলে নানা নিঃসংকোচে লুঙ্গি খুলে হাতে নিলেন, তারপর পানি নেমে ওপারে গিয়ে আবার লুঙ্গি পরে নিলেন।
ওদিকে রাফি একটু থেমে বলল,
—নানা, একটু দাঁড়াও! তুমি না এখনই শুনলা যে লুঙ্গি ওপরে তোলা হারাম! এখন আবার লুঙ্গিই খুললা! এইটা কেমন কাণ্ড?
নানা কিছু না বলে হেসে শুধু বললেন,
—তুই পার হ, পরে বলি।
রাফি একটু লজ্জা পেলেও গায়ে লুঙ্গি ভিজিয়ে খাল পার হলো। ওপারে উঠে লুঙ্গি চিপতে চিপতে বলল,
—দেখছো নানা, আমি কিন্তু তোমার মতো করিনি। আমি ফরজ তরফ না কইরা লুঙ্গি ভিজাইয়া পার হয়েছি।
নানা তখন হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
—তোর লুঙ্গি শব্দ কেন করে এমন করে হাঁটতেছে কেন ?
রাফি হাসল,
—ভিজা লুঙ্গি, তাই শব্দ করতেছে।
নানা এবার মৃদু হাসলেন, চোখে একটু মমতা, মুখে ধীর স্বরে বললেন,
—রাফি, তোর লুঙ্গি শব্দ করে, কারণ তুই ওয়াজটা খালপাড়ে রেখে আসনি। কিন্তু আমি ওয়াজটা খালপাড়েই রেখে এসেছি, তাই আমার লুঙ্গি আর শব্দ করে না রে।
রাফি থমকে গেল। তার মনে হল, এই কথার ভেতরে যেন পুরো জীবনদর্শন লুকিয়ে আছে। তারা দু’জনেই চুপচাপ হাঁটতে লাগল।
সন্ধ্যার লাল আলোয় নদীর পানি চকচক করছে, দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। রাফি ভাবছে—
> “আমরা কত সুন্দর সুন্দর ওয়াজ শুনি, নসিহত শুনি, কিন্তু সেগুলো নিজের জীবনে আনি না। শুনে যাই, প্রশংসা করি, তারপর খালপাড়ে ফেলে রেখে আসি।”
সেদিন থেকে রাফির জীবনে যেন একটা পরিবর্তন এলো। সে আর শুধু শুনেই সন্তুষ্ট থাকল না—ছোট ছোট আমল দিয়ে শুরু করল। নামাজে নিয়মিত হলো, মিথ্যা বলা কমাল, বড়দের সম্মান করতে লাগল।
গ্রামের লোকেরা যখন তাকে দেখে বলে—
—রাফি, তুই তো একদম বদলাইয়া গেছিস রে!
তখন সে শুধু হাসে। তার কানে বাজে সেই কথাগুলো—
“ওয়াজটা খালপাড়ে রেখে আসিনি।”
🌺নৈতিক শিক্ষা:
আমরা প্রতিদিন ধর্মীয় বয়ান শুনি, নীতি-কথা শুনি, কিন্তু সেগুলোর উপর আমল করি না। কেবল শোনার মধ্যে ধর্ম নেই; আসল ধর্ম হলো সেই শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা। যারা ওয়াজ খালপাড়ে ফেলে আসে, তারা পরিবর্তন পায় না; যারা মনে রাখে, তারা পথ পায়।
🖋️শেষ কলমে,
মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL ISLAM.



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন