ছোট গল্প:ছোট-বড় তফাৎ, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺 তারিখ:০৩/১২/২০২৫
ছোট গল্প:ছোট-বড় তফাৎ
অনেক দিন আগে, সুন্দর গ্রামীণ পরিবেশে বসবাস করতেন কামাল চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানী, ধৈর্যশীল, এবং আদর্শবান ব্যক্তি। তাঁর ছয় পুত্র ছিল। বড় থেকে ছোট পর্যন্ত তারা হলেন—প্রথম পুত্র, দ্বিতীয় পুত্র, তৃতীয় পুত্র, চতুর্থ পুত্র, পঞ্চম পুত্র, এবং ষষ্ঠ পুত্র। প্রতিটি ছেলে স্বভাব, বুদ্ধি, ও আগ্রহের দিক থেকে আলাদা।
কামাল চৌধুরী নিজের ছেলেদের বয়স অনুযায়ী শ্রেণীবিন্যাস করতেন। বড়রা বড়দের মতো চিন্তাশীল, দায়িত্বশীল, আর ছোটরা ছোটদের মতো চঞ্চল ও উদ্যমী। তবে তিনি সবসময় মনে করতেন যে বয়স কেবল সংখ্যা। আদব, শৃঙ্খলা, এবং যোগ্যতা সবসময় বয়সের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একদিন, বাড়িতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং বসার আয়োজন হলো। বাড়ির উঠোনে বড় ছাদের নিচে চেয়ার সাজানো হলো। মেহমানদের জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে। কামাল চৌধুরী মিটিং-এর আগে ছেলেদের নির্দেশ দিলেন—
“প্রিয় ছেলেরা, আজ মেহমানরা আসবে। তুমি যে জায়গায় বসবে, তা তার যোগ্যতা ও আচার অনুযায়ী হওয়া উচিত। ছোটদের বড়দের জায়গা না দখল করতে হবে, আর বড়দের তাদের দায়িত্বপূর্ণ আচরণ দেখাতে হবে।”
কিন্তু ছোট ছেলেরা, যারা খেলাধুলা করতে ভালোবাসে, ঠিকমতো কথা শোনেনি। মিটিং শুরু হবার সময়, ছোট পুত্রটি যে চেয়ারের উপরে চড়ল, সেটি ছিল মাপধরের চেয়ার। মেজো ছেলে গিয়ে চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসল। আর বাকি ছেলেরা নিজেদের মতো করে বিভিন্ন জায়গায় বসে পড়ল।
মেহমানরা অবাক হয়ে গেল। কেউ কেউ রাগান্বিত হলো। কেউ বলল, “কামাল সাহেবের ছয় পুত্রের কোনো আদব কায়দা নেই। তারা শুধু বয়সে বড়, কিন্তু আদবে বড় নয়।”
কামাল চৌধুরী শান্তভাবে এগিয়ে এলেন। তিনি ছোটদের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
“শোনো ছেলেেরা, আজ আমি তোমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেব। যে যে স্থানে বসার যোগ্য, সে স্থানে বসা উচিত, বড় বা ছোট হওয়ার ব্যাপার নয়। বয়স বড় হওয়া মানেই আদব বড় হওয়া নয়। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ক্ষমতাশালী, বিদ্যাবান, বা যোগ্য হয়, তবে তাকে সম্মান দেওয়া উচিত। আর যিনি ছোট, তারও সুযোগ থাকা উচিত যদি সে যোগ্য হয়।”
ছেলেরা প্রথমে কিছুটা হকচকিয়েছিল। তারা বুঝতে পারছিল না বাবা ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন। কামাল চৌধুরী তাদের কাছে একটি উদাহরণ দিলেন—
“ধরো, তুমি ছোট পুত্র। যদি তুমি অন্যদের চেয়ে বুদ্ধি, ধৈর্য, বা জ্ঞানী হও, তবে তুমি বড়দের মতো সম্মান পাওয়ার যোগ্য। আবার বড় ছেলে যদি গর্বে ভরা বা অসংযমী, তবে সে তোমার চেয়ে কম মূল্যবান।”
কামাল চৌধুরীর এই কথা শুনে ছেলেরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারল যে আদব ও যোগ্যতা বয়সের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মিটিং শেষে, কামাল চৌধুরী ছেলেদের সঙ্গে বসলেন। তিনি বললেন, “আজ আমি তোমাদের দেখিয়েছি ছোট-বড় তফাৎ শুধু বয়সের নয়। এটি হলো চরিত্র, সম্মান, শৃঙ্খলা, এবং যোগ্যতার। যারা আদব শিখেছে, তারা বড়, আর যারা তা শিখেনি, তারা ছোটই থেকে যায়।”
ছেলেরা বুঝতে পারল যে, ছোট বা বড় হওয়া শুধু শারীরিক বা জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়। আদব, সৎচরিত্র, দায়িত্বশীলতা, এবং সদাচার হলো সত্যিকারের বড় হওয়ার মানদণ্ড।
এরপর থেকে, ছয় ভাই প্রতিটি অনুষ্ঠানে, বাড়িতে, এমনকি মাঠে খেলাধুলার সময়ও পরস্পরের প্রতি সম্মান দেখাতে শিখল। তারা বুঝতে পারল যে সবার জায়গা আলাদা, কিন্তু যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মান সমানভাবে বিতরণ করা যায়।
একদিন আবার মিটিং হলো। এবার ছেলেরা নিজ নিজ স্থান বুঝে বসল। ছোটরা বড়দের সম্মান দেখাল, আর বড়রা ছোটদের প্রতি উদারতা দেখাল। মেহমানরা প্রশংসা করল। কেউ কেউ বলল, “আজ আমরা দেখলাম আদব আসলেই বড় হওয়ার পরিচয়।”
কামাল চৌধুরী হাসলেন এবং বললেন, “মহানবী( সা:) এর মতো, একজন মানুষের মর্যাদা তার শিক্ষায়, আচরণে এবং যোগ্যতায়। বড় বা ছোট হওয়া কেবল সংখ্যা নয়। বড় হওয়ার মানে হলো বোঝাপড়া, সদাচার, এবং শ্রদ্ধাশীল হওয়া।”
ছেলেরা ধীরে ধীরে এই শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করল। তারা শিখল—
বড়দের উচিত ছোটদের প্রতি দয়া, মমতা, এবং শিক্ষা প্রদানের মনোভাব রাখা।
ছোটদের উচিত বড়দের প্রতি সম্মান, শৃঙ্খলা, এবং ধৈর্য প্রদর্শন করা।
যোগ্যতা ও আদবই সত্যিকারের বড় হওয়ার মানদণ্ড।
এভাবে, ছয় ভাই ঘরের প্রতিটি কার্যক্রমে, খেলাধুলায়, এবং মিটিংয়ে আদব ও সম্মান বজায় রাখতে শুরু করল। তারা বুঝতে পারল যে ছোট-বড় তফাৎ কেবল জন্ম বা বয়সের নয়, বরং চরিত্র ও মননের।
কয়েক বছর পর, কামাল চৌধুরীর ছেলেরা সমাজে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলল। বড় ভাই হিসেবে দায়িত্ব, ছোট ভাই হিসেবে কৌশল, এবং সকলের মধ্যে আদব ও শৃঙ্খলা ছিল দৃঢ়। মানুষ তাদের দেখে অভিভূত হতো। তারা বুঝতে পারল যে, সত্যিকারের বড় হওয়া মানে হলো বয়সের চেয়ে বেশি—শ্রদ্ধা, দয়া, এবং যোগ্যতার মাপকাঠি পূর্ণ করা।
🖋️শেষ কলমে, মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
✍️প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।
তারিখ:০৩/১২/২০২৫
Copyright ©️ All ri
ghts reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন