শিরোনাম:🍌ছোট গল্প:চাকরানি

 শিরোনাম:🍌ছোট গল্প:চাকরানি



রচনার তারিখ:১১/১১/২৩

জাহানারা জানু চাকরানি ফজিলা বেগমের। কথাটা সে নিজেই বলে—কখনো গর্বে, কখনো আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে। গ্রামজুড়ে সবাই তাকে চেনে ভিক্ষুক হিসেবে। মাথায় জীর্ণ ওড়না, পায়ে ধুলো মাখা স্যান্ডেল, হাতে টিনের বাটি। অথচ তার চোখে ছিল একরকম স্থিরতা, যেন জীবনের কাছে পুরোপুরি হার মানেনি সে।


পশ্চিম  ছিলেন একসময়ের গৃহস্বামীণী।  যাওয়ার পর দেনা আর অসুখে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েন। জাহানারা তখন অল্পবয়সী, সংসারের হাল ধরার মতো শক্তি ছিল না। তাই সে ফজিলা বেগমের চাকরানি হয়েছিল—ঘর সামলানো, ওষুধ এনে দেওয়া, হাঁড়িতে চুলা জ্বালানো। কিন্তু দারিদ্র্য এমনই যে একসময় চাকরানি আর ভিক্ষুকের তফাত থাকে না। দুজনেই একই বাটিতে ভাগ বসায়।


জমিদার ফরিদ মিয়ার বাড়ির সামনে দিয়ে প্রতিদিনই জাহানারা যেত। বিশাল বাড়ি, উঁচু পাঁচিল, ভেতরে ছায়া-ঘেরা উঠোন। প্রথম দিন সে ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়েছিল গেটের পাশে। অনেক জমিদার বাড়িতে ভিক্ষুক দেখলে ধমক দেয়, তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ফরিদ মিয়ার বাড়িতে ঘটল অন্যরকম ঘটনা।


ফরিদ মিয়া তখন উঠোনে বসে হিসাব দেখছিলেন। জাহানারাকে দেখে তিনি হাত তুলে ডাকলেন,

—এই যে মেয়ে, কাছে এসো। কী চাও?


জাহানারা কাঁপা গলায় বলল,

—একটু চাল বা যা দেন হুজুর। ফজিলা বেগম অসুস্থ।


ফরিদ মিয়া তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। চোখে ভিক্ষার ভিক্ষে নয়, কাজের আগ্রহ দেখলেন। তিনি বাড়ির ভেতর থেকে চাল-ডাল আনতে বললেন, সঙ্গে এক বাটি ভাতও। কিন্তু এখানেই শেষ করলেন না।

—তুমি কি কাজ করতে পারো? রান্না, ঘরদোর?


জাহানারা মাথা নাড়ল।

—সবই পারি হুজুর। চাকরানি ছিলাম।


সেদিন থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরল। ফরিদ মিয়া তাকে শুধু দান করেননি, কাজের লোকের মর্যাদা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন,

—ভিক্ষা কারও পরিচয় নয়। কাজই মানুষের আসল সম্মান।


জাহানারা কাজ পেল—প্রথমে উঠোন ঝাড়ু, পরে রান্নাঘরে সাহায্য। কেউ তাকে “ভিক্ষুক” বলে ডাকত না। সবাই বলত “জানু।” নামটা ছোট, কিন্তু মর্যাদার।


সে সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফিরে ফজিলা বেগমকে সব খুলে বলল। ফজিলা বেগম চোখ ভিজিয়ে বললেন,

—আল্লাহ তোমার সহায় হয়েছেন মা। সম্মান নিয়ে কাজ করো।


দিন গড়াল। জাহানারা কাজ শিখল, রান্নায় হাত পাকাল। ফরিদ মিয়ার স্ত্রী তাকে নিজের মেয়ের মতো করে শেখাতেন। বেতন নিয়মিত, কথা নরম। কোনো ভুল হলে ধমক নয়—বোঝানো। জমিদার বাড়ির অন্য কাজের লোকজনও তাকে আপন করে নিল।


একদিন বাজারে যেতে যেতে কেউ ঠাট্টা করে বলল,

—এই যে ভিক্ষুক, আজ কোথায়?


জাহানারা থামল না। শান্ত গলায় বলল,

—ভিক্ষুক ছিলাম। এখন কাজের মানুষ।


এই কথাটা সে সেদিন প্রথম বুঝেছিল—সম্মান কেউ দান করে না, সুযোগ দিলে মানুষ নিজেই গড়ে তোলে।


ফজিলা বেগম ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন। জাহানারার আয়ে সংসার চলল। ভিক্ষার বাটি একদিন সে উঠোনের কোণে তুলে রাখল। আর হাতে নিল কাজের ঝাঁপি।


ফরিদ মিয়া একদিন বললেন,

—জানু, মানুষের মূল্য তার অবস্থায় নয়, তার ব্যবহারেই বোঝা যায়।


জাহানারা মাথা নিচু করে শুনল। চোখে কৃতজ্ঞতার জল। সে জানত—এই বাড়ি তাকে শুধু কাজ দেয়নি, মানুষ হিসেবে দাঁড়ানোর জায়গা দিয়েছে।


🖋️শেষ কলমে, মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম

🍌প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।

রচনার তারিখ:১১/১২/২৩

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ