শেখ ফরিদ উদ্দিনের দূরসাগর অভিযাত্রা 🖋️রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম ✍️প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ। রচনায় তারিখ:১১/১২/২০১০

 ©️শেখ ফরিদ উদ্দিনের দূরসাগর অভিযাত্রা

🖋️রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 

✍️প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।

রচনায় তারিখ:১১/১২/২০১০

ছবি -২০১৪/১৫


গজনির সেই বিখ্যাত সাম্রাজ্য, যেখানে বাদশাহ অনুপম চৌধুরীর শাসনকালে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার ছিল বিশ্ববিখ্যাত। বাদশাহ ছিলেন সুবিচারক, আল্লাহভীরু এবং দরিদ্রদের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল। তাঁর একমাত্র ছেলে—শেখ ফরিদ উদ্দিন। ছোটবেলা থেকেই ছেলেটি ছিল দৃঢ় মানসিকতার, জ্ঞানপিপাসু এবং অসাধারণ সাহসের অধিকারী। আল্লাহর ভয় তার অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।


১৭ বছর বয়সে হঠাৎ তার মনে জন্ম নিল এক মহা স্বপ্ন— দেশভ্রমণ, বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে উজান দ্বীপ অভিযাত্রা।


স্বপ্নের প্রারম্ভ


একদিন বিকেলে, সূর্যের শেষ আলো যখন বাদশাহি প্রাসাদের সোনালি মিনারে ঝিকমিক করছিল, ফরিদ উদ্দিন বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন—


— “বাবা, আমি উজান দ্বীপে যেতে চাই। প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেব। আমি দেশ দেখতে চাই, মানুষ দেখতে চাই, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই। আল্লাহ আমাকে যে জীবন দিয়েছেন, তাতে আমি কিছু মহৎ কাজ করতে চাই।”


বাদশাহ প্রথমে বিস্মিত হলেন, পরে কঠিন কণ্ঠে বললেন—


— “ফরিদ, এই পথ বিপদে ভরা। খাদ্যের অভাব, ডাকাতের হামলা, সাগরের ঝড়, পথভোলা, মৃত্যুভয়—অনেক পরিক্ষা আসবে। এমনও হতে পারে, তুমি আর ফিরতে নাও পারো।”


কিন্তু ফরিদ উদ্দিনের সংকল্প ছিল অটল। তিনি নম্র স্বরে বললেন—


— “বাবা, আমার তাওয়াক্কুল আল্লাহর উপর। আপনি শুধু দোয়া করুন।”


বাদশাহ গভীরভাবে তাকালেন ছেলের চোখে। তিনি দেখলেন অদম্য সাহস, নিষ্কলুষ ঈমান। অবশেষে বললেন—


— “তিনটি কথা মনে রেখো—

১. মৃত্যুর ভয় তোমাকে যেন অচল না করে।

২. আল্লাহর উপর ভরসা হারাবে না।

৩. অর্থের মোহে পড়ে কখনো আত্মাকে বিকিয়ে দেবে না।”


ফরিদ উদ্দিন বাবার পা ছুঁয়ে বিদায় নিলেন।


সাগরযাত্রার সূচনা


কয়েকদিন পর বিশাল নৌযান প্রস্তুত হলো। একদল নাবিক, কিছু যাত্রী, আর কিছু বণিকসহ ফরিদ উদ্দিন যাত্রা শুরু করলেন। প্রথম কয়েকদিন আবহাওয়া শান্ত ছিল। কিন্তু সাগর তো সাগর—মুহূর্তেই রূপ বদলায়।


একদিন বিকেলে হঠাৎ তুফান শুরু হলো।

নৌকা দুলছে, আকাশ গর্জে উঠছে। বৃষ্টির ধারায় সামনের পথ দেখা যায় না। এই অবস্থায় ফরিদ উদ্দিন খোদাভীরু মানুষের মত দুহাত তুলে দোয়া করলেন—


— “হে আল্লাহ, আপনি আমাদের রক্ষা করুন। আপনার সাহায্য ব্যতীত আমরা অসহায়।”


এই দোয়ার পরই নৌকার সামনে দেখা দিল এক লোক—যাকে সবাই “দালাল” বলে ডাকত। লোকটি ছিল ধূর্ত প্রকৃতির, বিপথগামী মানুষকে সহজেই প্রতারণায় ফেলতে পারত। সে বলল—


— “যুবক, আমি পারলে তোমাকে বাঁচাবো। তবে তোমাকে আমার কথা শুনতে হবে। তোমার ভয়, ক্ষুধা, অর্থ—এসবের বিনিময়ে আমাকে মানতে হবে।”


এই মুহূর্তে ফরিদ উদ্দিন বাবার কথা মনে করলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বললেন—


— “আমার ভরসা শুধু আল্লাহ। বিপদে পড়ে কারো ভুল দালালির শরণ নেব না।”


দালাল ক্ষীণ হাসি দিয়ে সরল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। সে পরিকল্পনা আঁটতে শুরু করল।


শয়তান নারীর প্রলোভন


নৌকা যখন ঝড় পেরিয়ে শান্ত পানিতে পৌঁছাল, তখন যাত্রীদের মাঝে দেখা দিল এক ছলনাময়ী নারী। দেখলেই বোঝা যায়—চোখে ভরপুর কৌশল, কথায় মায়াজাল।


সে দালালির সঙ্গে যোগসাজশে ছিল। উদ্দেশ্য—ফরিদ উদ্দিনকে পাপে লিপ্ত করা, তার মিশন ব্যর্থ করা, ইমান দুর্বল করা।


এক সন্ধ্যায় সে নীরবে এসে বলল—


— “যুবক, এই পথ খুব কঠিন। তুমি একা সব পারবে না। আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি, সঙ্গ দিতে পারি…”


ইঙ্গিত স্পষ্ট। প্রলোভন তীব্র। প্রথমে অন্তরে জাকের করে দেখলেন, বিপুল পরিমাণ খোকাগুলো পোকা নিয়ে খেলা করছিল। এদিকে বিবেচনা করে সাগরে কাঁদাবালি , চোরাবালি,কাশি নানান সমস্যা পেরিয়ে তিনি চলতে লাগলেন। পরিশেষে 


ফরিদ উদ্দিন বললেন—


— “পথের মুসাফিরকে সহযোগিতা করা সওয়াবের কাজ, কিন্তু পাপের পথে টানা শয়তানের কাজ। আমি আল্লাহর ভয় করি। দূরে দাঁড়ান।”


নারীর মুখ বিকৃত হয়ে গেল। ব্যর্থতার তীব্র রাগে সে দালালির কাছে গিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র সাজালো।


খাদ্যের সংকট ও মৃত্যুভয়


যাত্রা দীর্ঘ হতে লাগল। খাবার ফুরোতে শুরু করল।

একপর্যায়ে নাবিকরা হতাশ হয়ে বলল—


— “আমরা বাঁচবো না।”

ফরিদ উদ্দিন বললেন—

— “মৃত্যু আল্লাহর হাতে। ধৈর্য ধরো। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”


তিনি খাবার সঞ্চয় ঠিকভাবে ভাগ করলেন, সবার মনোবল বাড়ালেন। অল্প খাবারেও আল্লাহ বরকত দিলেন। এই বরকতেই নৌযাত্রা অনেকদূর অগ্রসর হলো।


ডাকাতদের হামলা


এক রাতে চাঁদহীন আকাশে হঠাৎ দেখা গেল কয়েকটি জলদস্যু নৌকা। ছায়ার মত এগিয়ে আসছে। তলোয়ার, আগুন, চিৎকার—চারদিকে ভয়াবহ দৃশ্য।


দালাল আর তার সঙ্গীরা এই সুযোগে আবার চেষ্টা করল ফরিদকে ভয় দেখাতে—এমনকি তিনি ভয় না পেয়ে সোহাগ মাখা হৃদয় নিয়ে। দালালি অপশক্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন।


— “দেখলে? এখন যদি আমাদের সাথে চুক্তি করো, বাঁচতে পারো।”


ফরিদ উদ্দিন বললেন—


— “জীবন-মৃত্যু কারও হাতে নয়। শুধু আল্লাহর হাতে। তোমাদের প্রলোভন ব্যর্থ হবে।”


যুদ্ধ শুরু হল। আল্লাহর রহমতে ডাকাতরা পরাজিত হল। কিছু পালিয়ে গেল, কিছু বন্দী হলো।


প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি


মাসের পর মাস কেটে গেল—অবশেষে দেখা গেল উজান দ্বীপের সবুজ রেখা।

ফরিদ উদ্দিন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন।


কিন্তু দ্বীপে নেমেই তিনি দেখলেন—দালাল ও জলদস্যুরা নতুন করে ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত। তারা দ্বীপের কিছু অসৎ মানুষকে নিয়ে ফরিদকে হত্যা এবং তার অর্থ লুটের পরিকল্পনা করছে।


কিন্তু এখন ফরিদ আর আগের ১৭ বছরের ছেলে নন। এই ভ্রমণে তিনি অনেক শক্ত, জ্ঞানী, কৌশলী হয়ে উঠেছেন।


তিনি লোকজন জড়ো করলেন, তাদের উদ্দেশ্যে বললেন—


— “যারা পথে বাধা সৃষ্টি করে, যারা ডাকাতি করে, যারা মানবতার পথে বিষ বপন করে—আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না। আর যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, আল্লাহ তাদের মর্যাদা দেন।”


তিনি দালালদের ধরে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন।

অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের শাস্তি কার্যকর করা হলো।


উজান দ্বীপের মানুষ তাকে নায়ক হিসেবে গ্রহণ করল। এমনকি দ্বীপের বাদশাহ তার কন্যাকে ফরিদের কাছে বিবাহ দিয়ে দিলেন, সম্মানস্বরূপ সৈন্য ও নাবিকও দিলেন যাতে তিনি নিরাপদে দেশে ফিরতে পারেন।


ফেরার যাত্রা


নতুন স্টিমার যুগ শুরু হয়েছে। বাদশাহ স্বয়ং নতুন প্রযুক্তির স্টিমার ফরিদের জন্য প্রস্তুত করলেন। সৈন্য, নাবিক, পরিবারসহ তিনি দেশে ফিরে এলেন।


দেশে ফিরে এলেন আরও শক্ত, আরও অভিজ্ঞ, আরও আল্লাহভীরু মানুষ হয়ে।


তিনি ঘোষণা করলেন—


— “যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, আল্লাহ তাদের জান্নাতে উত্তম স্থান দেন। আর যারা মানুষকে বাধা দেয়, পাপ-সন্ত্রাস ছড়ায়—তাদের পরিণাম ভয়াবহ।”


অপরাধীদের বিচার হলো। দালালিদের শাস্তি কার্যকর করা হলো। দেশে শান্তি ফিরল।


গজনির মানুষ বলল—

“শেখ ফরিদ উদ্দিন শুধু দেশে ফেরেননি, তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে ফিরেছেন।”


তার এই যাত্রা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উদাহরণ হয়ে রইল—

ইমান, সাহস ও তাওয়াক্কুল দিয়ে আল্লাহর বান্দা যেকোনো কঠিন পথ অতিক্রম করতে পারে।



🖋️শেষ কলমে, মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম

✍️প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা নওগাঁ।

©️তারিখ:০২/১২/২০১০

Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ