ছোটগল্প: কদু মিয়ার ভিক্ষাবৃত্তি, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম

 ছোটগল্প: কদু মিয়ার ভিক্ষাবৃত্তি



গ্রামের নাম শালবাগান। সেখানে বাস করতেন এক বৃদ্ধ ফকির—কদু মিয়া। তার চেহারায় কালের ছাপ স্পষ্ট, চোখে-মুখে নির্লজ্জ অভ্যাসের রেখা। কদু মিয়ার জীবনের বড় পরিচয় হলো—তিনি ভিক্ষা করেন। কিন্তু ভিক্ষার ধরনও ছিল অদ্ভুত। কোনো বাড়িতে ভাতের হাঁড়ি চড়লে অর্ধেক রান্না হতেই তিনি দরজায় এসে দাঁড়াতেন। আর সেই সময়ে তার স্বভাবসুলভ ডাক ভেসে উঠতো—

—“বাঁচতে পারলাম না আইগাও গো, লও গো।”

এমন করে তিনি দিনের পর দিন পেট চালাতেন। সন্ধ্যা হলে আবার আরেক রকম ডাক শোনা যেত কদু মিয়ার কণ্ঠে—
—“কেঠা গো কে যাও,
এটি ছিল তার রাত্রির স্বভাব। যেন ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে তার ডাকাডাকিও গ্রামের বাতাসে মিশে গেছে।

কদু মিয়ার সংসারও ছোটখাটো নয়। প্রথম স্ত্রীর সংসারে এক ছেলে, দুই মেয়ে। স্ত্রী মারা গেলে তিনি আবার বিয়ে করেন সখিনা বিবিকে। কিন্তু সখিনা বিবির কপালে সন্তান জোটেনি। জীবনের দুঃখের বোঝা আর কদু মিয়ার ভিক্ষাবৃত্তির লজ্জা নিয়েই তার দিন কাটতে থাকে।

কদু মিয়ার ছেলে চটকু মিয়া, আর দুই মেয়ে—কৈতরিবানু ও ফকিরা বিবি। সন্তানরা বড় হয়, ঘর-সংসার করে। কিন্তু বাবার খোঁজ-খবর নেয় না।

গ্রামের লোকজন মাঝেমধ্যেই বলে—
—“চটকু মিয়া, তোমার বাবা কদু মিয়াকে একটু দেখো না?”
—“এই দিকে তরিবানু, ওই ফকিরা বিবি, তোমাদের বাবা দিনরাত ভিক্ষা করছে, একবার খোঁজ নাও।”

কিন্তু সন্তানদের কর্ণে যেন কিছুই পৌঁছায় না। তাদের চোখে কদু মিয়া এক দায়, এক লজ্জার কারণ।

---

কদু মিয়ার ভিক্ষাবৃত্তি ধীরে ধীরে তার সামাজিক পরিচয়ে পরিণত হয়। গ্রাম তাকে আর কৃষক বা মজুর বলে ডাকে না, বরং ‘ভিক্ষুক কদু মিয়া’ হিসেবেই চেনে। সন্তানরা এই লাঞ্ছনার ভয়ে পিছু হটে, কিন্তু কদু মিয়া স্বভাব পরিবর্তন করতে জানেন না।

সমাজে যখন কেউ দারিদ্র্যের কারণে ভিক্ষা করে, তখন তা এক রকম। কিন্তু যখন ভিক্ষা মানুষের স্বভাব ও পরিচয়ে পরিণত হয়, তখন তা লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কদু মিয়া সেই লজ্জার প্রতীক।

গ্রাম তাকে করুণা করে, আবার বিদ্রূপও করে। মানুষ ভাবে—“একজন মানুষ কীভাবে সারাজীবন কাজ না করে শুধু ভিক্ষা করে বাঁচতে পারে?”

অবশেষে একদিন সন্ধ্যায় কদু মিয়ার ডাক আর ভেসে আসলো না। গ্রামের মানুষ খুঁজতে খুঁজতে তাকে পুকুরপাড়ের গাছতলায় মৃত অবস্থায় পেল। পাশে তার ভিক্ষার ঝোলা পড়ে আছে, ভেতরে সামান্য ভাত আর শুকনো রুটি।

সন্তানরা লজ্জায় মুখ ঢাকলো, কিন্তু তখন আর কিছু করার নেই। সারা গ্রাম দীর্ঘশ্বাস ফেললো—
“মানুষ কাজ করলে বাঁচে, ভিক্ষা করলে নয়।”

নৈতিক শিক্ষা
ভিক্ষা মানুষের জীবনধারণের শেষ আশ্রয় হতে পারে, কিন্তু কখনোই জীবনের স্বাভাবিক পেশা নয়। কাজের মর্যাদা আছে, কিন্তু ভিক্ষার নেই। সন্তানরা যদি পিতামাতার দায়িত্ব নিতে না শেখে, তবে সমাজেও তাদের সম্মান থাকে না।

🖋️শেষ কলমে,
🖊️মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
✍️আরবি প্রভাষক বলদীআটা ফাজিল মাদ্রাসা
ধনবাড়ী টাঙ্গাইল জেলা।

Copyright ©️ All rights reserved by author maulana MD FARIDUL Islam.

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ