ব্যভিচার ও রেশম মদ, বাদ্যযন্ত্র হালাল গন্য করার ভয়াবহ পরিণতি।

 

ব্যভিচার ও রেশম মদ, বাদ্যযন্ত্র হালাল গন্য করার ভয়াবহ পরিণতি।

ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল গণ্য করার ভয়াবহ পরিণতি

সহিহ হাদিসের আলোকে এক গভীর আলোচনা

ভূমিকা
মানবজীবনের পথপ্রদর্শক কিতাব হলো আল-কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রদত্ত সুন্নাহ। ইসলামী শরীয়তের প্রতিটি নির্দেশনা মানুষের কল্যাণের জন্যই নির্ধারিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ ভবিষ্যতের বহু ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক করে গেছেন। তাঁর এই সতর্কবাণীগুলো যুগে যুগে মুসলমানদেরকে ঈমান রক্ষার জন্য প্রহরীর মতো কাজ করেছে।
সহিহ বুখারীতে বর্ণিত একটি সুপ্রসিদ্ধ হাদিসে নবীজী ﷺ তাঁর উম্মতের কিছু লোক সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল গণ্য করবে। হাদিসে এর ভয়াবহ পরিণতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে—তাদের ধ্বংস, পাহাড় ধসে পতন এবং বানর-শূকর রূপে বিকৃত হওয়া।
এ প্রবন্ধে আমরা আলোচ্য হাদিসটির মূল বক্তব্য, এর ব্যাখ্যা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ইসলামী আইন অনুযায়ী এর বিধান, এবং আধুনিক সমাজে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

হাদিসের মূল বর্ণনা
আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ'আরী (রহঃ) বলেন:
“আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ'আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি মিথ্যা বলেননি। তিনি নবী ﷺ-কে বলতে শুনেছেন:
> ‘আমার উম্মতের মধ্যে অবশ্যই এমন কিছু দল হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। আবার কিছু লোক পাহাড়ের ধারে বাস করবে, পশুপাল নিয়ে ফিরবে। তখন কোন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি তাদের কাছে আসবে সাহায্যের জন্য। তারা বলবে, কাল এসো। রাতারাতি আল্লাহ তাদের ধ্বংস করবেন, পাহাড় ধ্বসে যাবে এবং কিছু লোককে বানর ও শূকরে রূপান্তর করবেন, যা চলবে কিয়ামত পর্যন্ত।’
(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫৫৯০)

হাদিসের ব্যাখ্যা
১. “ইয়াস্তাহিল্লূন” শব্দের তাৎপর্য
এখানে নবী ﷺ বলেছেন—“উম্মতের কিছু লোক এগুলোকে হালাল মনে করবে।” এর অর্থ হলো:
তারা কাজগুলো করবে এবং শরীয়তের নিষেধাজ্ঞাকে অস্বীকার করবে।
হালাল বলা মানে শুধু কাজে লিপ্ত হওয়া নয়, বরং এটাকে বৈধ দাবি করা।
তাই এরা শুধু গুনাহগারই নয়, বরং ঈমানের সীমারেখা থেকেও বেরিয়ে যেতে পারে।

২. ব্যভিচার (الحر)
ব্যভিচারকে ইসলামে সর্বনাশা অপরাধ বলা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
> “তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।”
(সুরা ইসরা: ৩২)
এই হাদিসে নবী ﷺ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে উম্মতের কিছু মানুষ ব্যভিচারকে বৈধ করে নেবে। আজকের যুগে আমরা দেখি—নগ্নতা, অবাধ সম্পর্ক, পরকীয়া, অবৈধ সম্পর্ককে “স্বাধীনতা” নামে প্রচার করা হচ্ছে। অনেক মুসলিম দেশেও আইনগতভাবে ব্যভিচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। এটি হাদিসের ভবিষ্যদ্বাণীর জীবন্ত প্রতিফলন।

৩. রেশম (الحرير)

পুরুষের জন্য রেশম ব্যবহার নবী ﷺ স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন:

> “রেশম ও সোনা আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম, আর নারীদের জন্য হালাল।”
(তিরমিযী, হাদিস ১৭২০)
রেশম হলো বিলাসিতা, অহংকার ও ভোগবাদের প্রতীক। নবী ﷺ পুরুষদের বিনয়ী জীবনযাপনের শিক্ষা দিয়েছেন, যা রেশম ব্যবহার নষ্ট করে ফেলে।

৪. মদ (الخمر)
মদ বা নেশাজাতীয় দ্রব্য ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ বলেন:
> “হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্যনির্ধারক তীর শয়তানের অপবিত্র কাজ। তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা সফল হও।”
(সুরা মায়েদা: ৯০)

✓নবী ﷺ বলেছেন:
> “যা অধিক পরিমাণে নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।”
(আবু দাউদ, হাদিস ৩৬৮১)
কিন্তু আধুনিক সমাজে মদকে সামাজিক মর্যাদা ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। অনেক মুসলিম দেশেও মদের ব্যবসা বৈধভাবে চলছে।

৫. বাদ্যযন্ত্র (المعازف)
বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কেও নবী ﷺ কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। অনেক সাহাবী ও তাবেয়ীও একে হারাম বলেছেন। কারণ:এটি মানুষের অন্তরে গুনাহর প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি করে।
আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
নফসের কামনা বাড়ায়।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেন:
“বাদ্যযন্ত্র হলো মদের বোন।”
অর্থাৎ মদ যেমন মানুষকে গুনাহের দিকে টানে, বাদ্যযন্ত্রও তেমনি।

হাদিসে বর্ণিত শাস্তি
১. পাহাড় ধসে ধ্বংস
যে দল গুনাহ করে এবং গরীবকে ফিরিয়ে দেয়, আল্লাহ তাদেরকে রাতারাতি পাহাড় ধসে ধ্বংস করবেন। এটি ইঙ্গিত দেয়—আল্লাহর শাস্তি যখন আসে, তখন তা হঠাৎ করেই আসে।

২. বানর ও শূকরে রূপান্তর
কিছু লোককে কিয়ামত পর্যন্ত বানর ও শূকরে রূপান্তরিত রাখা হবে। এখানে “মাসখ” (রূপান্তর) শারীরিক হতে পারে, আবার আধ্যাত্মিকও হতে পারে।
শারীরিক: আল্লাহ অতীতে বনী ইসরাইলের একটি দলকে শূকর ও বানর বানিয়ে দিয়েছিলেন (সুরা বাকারা: ৬৫)।
আধ্যাত্মিক: হৃদয় ও চরিত্র পশুর মতো হয়ে যায়—কেউ লোভে শূকরের মতো, কেউ কামনায় বানরের মতো।

ঐতিহাসিক প্রমাণ
✓ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে, যখন কোন সমাজ গুনাহকে হালাল গণ্য করেছে, তখন আল্লাহর কঠিন শাস্তি নেমে এসেছে।
✓বনী ইসরাইল ব্যভিচার ও মদে লিপ্ত হলে তাদের উপর বহু বিপর্যয় নেমে আসে।
✓রোমান ও গ্রিক সভ্যতা বিলাসিতা ও ব্যভিচারের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়।
✓ইসলামের ইতিহাসে বহু রাজবংশ পতিত হয়েছে গুনাহ ও বিলাসিতার কারণে।

আধুনিক সমাজে প্রাসঙ্গিকতা
১. ব্যভিচারকে বৈধতা দেওয়া – আজকের বিশ্বে “লিভ টুগেদার” বা অবাধ সম্পর্ককে স্বাভাবিক বলা হচ্ছে। এমনকি অনেক মুসলিম তরুণ-তরুণীও এটাকে “প্রেম” বলে বৈধ মনে করছে।
২. রেশম ও বিলাসিতা – পুরুষরা অহংকারের জন্য ব্র্যান্ডের বিলাসী পোশাক পরে। অথচ ইসলামী শিক্ষা হলো সরলতা।
৩. মদের প্রসার – বিশ্বব্যাপী মুসলিম দেশগুলিতেও মদ্যপান বাড়ছে। সামাজিক অনুষ্ঠানে মদকে ফ্যাশন বলা হচ্ছে।
4. বাদ্যযন্ত্র ও সংগীত – গান-বাদ্যকে আজ সংস্কৃতির মূল অংশ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এমনকি অনেক ইসলামী অনুষ্ঠানে গান-বাদ্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যা হাদিসের সতর্কবার্তার বিপরীত।

✓ইসলামের দৃষ্টিতে করণীয়
১. আল্লাহর ভয় জাগ্রত করা
আল্লাহর শাস্তির ভয় মনে রাখা। কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঈমানকে দৃঢ় করা।
২. সামাজিক সংস্কার
পরিবার ও সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। সন্তানদের সঠিক শিক্ষা দেওয়া।
৩. বিকল্প বিনোদন
বাদ্যযন্ত্র ও মদের পরিবর্তে হালাল বিনোদন প্রচার করা—কিতাবপাঠ, খেলাধুলা, কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী কবিতা ইত্যাদি।
৪. তাওবা ও ইস্তিগফার
গুনাহ থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। নবী ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোন গুনাহ করে, তারপর তাওবা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
(বুখারী, মুসলিম)

✓উপসংহার
এই সহিহ হাদিস আমাদের জন্য এক গুরুতর সতর্কবাণী। রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর উম্মতের একাংশ ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল করবে। অথচ এগুলো আল্লাহর কঠোরভাবে হারাম ঘোষিত বিধান।
আজকের সমাজে আমরা সেই ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। তাই মুসলমানদের জন্য জরুরি হলো—এ ফিতনা থেকে দূরে থাকা, আল্লাহর ভয় করা, এবং শরীয়তের সঠিক বিধান আঁকড়ে ধরা।

আল্লাহ বলেন:
> “তোমরা যা রাসূল তোমাদের দিয়েছেন, তা গ্রহণ করো, আর যা তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো।”
(সুরা হাশর: ৭)
হাদিসের শেষাংশে বানর-শূকরের মতো অপমানজনক শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য শিক্ষা—যদি আমরা গুনাহকে বৈধ গণ্য করি, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে অপমানজনক শাস্তি আসবে।
অতএব, আমাদের উচিত এই হাদিস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলা।

✒️ শেষ কলমে,
মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
আরবি প্রভাষক বলদীআটা ফাজিল মাদ্রাসা
ধনবাড়ী,টাঙ্গাইল জেলা।

Copyright ©️ by author all rights reserved -2025

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ