ছোট গল্প:ডিজিটাল যুগের আলো, রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম।

ছোট গল্প:ডিজিটাল যুগের আলো


অধম সাহেবের তিন পুত্র—চটকু, ঝটকা আর কোনি। নামের মতোই তাদের স্বভাবও একটু আলাদা আলাদা। তবে একটা জায়গায় তারা এক—তারা কেউই আধুনিক শিক্ষা বা প্রযুক্তির সাথে পরিচিত নয়। গ্রামের সহজ-সরল জীবনে তারা খুশিই ছিল, কিন্তু “ডিজিটাল যুগ” কথাটা শুনলেই তাদের মনে হতো এটা বোধহয় শহুরে লোকদের কোনো আজব খেলা।

পাশের বাড়ির সলিমুদ্দিন সাহেবের ছেলে রাশেদ ঢাকায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। ছুটিতে গ্রামে এলে সে মোবাইল, ইন্টারনেট, কম্পিউটার—এসব নিয়ে গ্রামের মানুষদের অনেক কিছু বোঝাত। সে বলত, “এখন মোবাইল দিয়েই কৃষির তথ্য, আবহাওয়ার খবর, রোগ-বালাই প্রতিকার—সব জানা যায়।”

গ্রামের অনেকে অবাক হয়ে শুনত, কেউ কেউ বিশ্বাস করত, আবার কেউ মনে মনে ভাবত—“এই ছেলেটা শহরে গিয়ে পাগল হয়ে গেছে!”

চটকু ছিল সন্দেহপ্রবণ। সে একদিন রাশেদের কথা শুনে হেসে বলল,
—“এই মোবাইল দিয়া আবার ধান ফলানোর খবর পাওয়া যায় নাকি? তা হলে তো আমরা বইলা দেই, মোবাইলই জমিতে বুনে দেই!”

ঝটকা সাথে সাথে হেসে উঠল,
—“হ, আর পানি দেওয়ার দরকার নাই, চার্জ দিলেই ফসল বড় হবে!”

কোনিও যোগ দিল,
—“আর ফসল কাটার সময় ‘ডাউনলোড’ কইরা ঘরে আনুমু!”

তিন ভাই এমন হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল যে আশেপাশের লোকজনও মজা পেয়ে গেল।

রাশেদ মুচকি হেসে বলল,
—“ঠিক আছে, তোমাদের সন্দেহ দূর করি।”

পরদিন সকালে রাশেদ চটকুকে নিয়ে মাঠে গেল। চটকুর জমিতে পোকা ধরেছে, ফসল ভালো হচ্ছে না। রাশেদ মোবাইল বের করে ইন্টারনেটে খুঁজে দেখাল—কোন পোকা, কী ওষুধ লাগবে, কতটা দিতে হবে।

চটকু অবাক হয়ে বলল,
—“এইটুকু যন্ত্র এত কিছু জানে?”

রাশেদ বলল,
—“যন্ত্র না, তথ্য জানে। আর তথ্যই এখন শক্তি।”

রাশেদের কথামতো চটকু ওষুধ প্রয়োগ করল। কয়েকদিনের মধ্যেই তার জমির অবস্থা ভালো হতে শুরু করল। গাছগুলো সবুজ হয়ে উঠল।

একদিন চটকু দৌড়ে এসে বলল,
—“ওরে ঝটকা! কোনি! তাড়াতাড়ি আয়! মোবাইল দিয়া ফসল বাঁচাইছি!”

ঝটকা বলল,
—“কি! সত্যি নাকি? না আবার ডাউনলোড কইরা আনছিস?”

চটকু এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
—“না রে, সত্যি। আগে হাসছিলাম, এখন বুঝছি—জ্ঞান থাকলে ছোট জিনিসও বড় কাজ করে।”

কোনি মাথা চুলকে বলল,
—“তাইলে আমরা এতদিন অন্ধের মতো ছিলাম নাকি?”

চটকু হেসে বলল,
—“না রে, আমরা ছিলাম ‘নেট ছাড়া মোবাইল’—দেখতে স্মার্ট, কিন্তু কাজের না!”

তিন ভাই এবার রাশেদের কাছে নিয়মিত যেতে শুরু করল। তারা শিখল—কিভাবে মোবাইল দিয়ে আবহাওয়ার খবর জানা যায়, নতুন কৃষি পদ্ধতি শেখা যায়, এমনকি বাজারদরও দেখা যায়।

একদিন অধম সাহেব ছেলেদের পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে বললেন,
—“তোরা তো একেবারে বদলে গেছিস!”

চটকু হাসিমুখে বলল,
—“বাবা, আগে আমরা শুধু মাঠে কাজ করতাম, এখন মাথাও কাজে লাগাই!”

সবাই হেসে উঠল।

শিক্ষা:
অজ্ঞতা মানুষকে পিছিয়ে রাখে, আর জ্ঞান মানুষকে এগিয়ে দেয়। প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়—এর সঠিক ব্যবহারই মানুষকে উপকার করে।

শেষ কলমে, মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ