ভুল থেকে মুক্তি
গ্রামের নাম চরকল্যাণপুর। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝখানে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, আর পথে পথে শিমুল–কদম গাছের ছায়া। ভোর হলে পাখির ডাক আর বিকেলে গরুর গাড়ির শব্দে গ্রামটা যেন নিঃশ্বাস নেয়।
এই গ্রামেই থাকত সলিমুদ্দিন। সে সুদের ব্যবসা করত। কেউ অসুস্থ হলে, কেউ ফসল নষ্ট হলে, কিংবা মেয়ের বিয়ের খরচে বিপদে পড়লে—সলিমুদ্দিনই ছিল প্রথম ভরসা। তবে সেই ভরসার আড়ালে লুকিয়ে ছিল কঠিন শর্ত আর চড়া সুদের বোঝা। শুরুতে সবাই হাসিমুখে টাকা নিলেও, শেষে সেই হাসিই হয়ে যেত দীর্ঘশ্বাস।
একই গ্রামে থাকতেন আলেম রহিম উদ্দিন। তিনি মসজিদের ইমাম, শান্ত স্বভাবের মানুষ। প্রতিদিন ফজরের পর তিনি মসজিদের বারান্দায় বসে কুরআন পড়তেন। গ্রামের মানুষজন তাঁর কাছে শুধু ধর্মীয় প্রশ্নই নয়, জীবনের জটিল সমস্যার কথাও খুলে বলত।
একদিন আসরের নামাজের পর রহিম উদ্দিন সলিমুদ্দিনকে ডেকে নিলেন। চারপাশে তখন নরম বিকেলের আলো, দূরে ধানক্ষেতে বাতাসে ঢেউ খেলছে।
রহিম উদ্দিন শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“ভাই সলিমুদ্দিন, আল্লাহ কুরআনে সুদকে স্পষ্টভাবে হারাম করেছেন। সুদ মানুষের সহানুভূতি নষ্ট করে, সমাজে বৈষম্য বাড়ায়। আর হাদিসে এসেছে—সুদখোর, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষী সবাই একই গুনাহে শরিক।”
সলিমুদ্দিন চুপ করে রইল। দূরে এক কৃষক তার ঋণের চিন্তায় মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরছিল—সে দৃশ্য যেন তার চোখে পড়ল।
রহিম উদ্দিন আবার বললেন,
“এই সুন্দর গ্রামটা দেখুন। সবুজ মাঠ, পরিষ্কার আকাশ—সবই আল্লাহর নিয়ামত। কিন্তু সুদের বোঝায় যদি মানুষের ঘরে অশান্তি থাকে, তাহলে এই সৌন্দর্যের মূল্য কী?”
সেদিন রাতে সলিমুদ্দিন অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারল না। জানালার বাইরে জোনাকির আলো আর দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মধ্যে তার মনে হতে লাগল—সে কি সত্যিই মানুষের উপকার করছে, নাকি ধীরে ধীরে গ্রামের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে?
পরদিন সকালে সে রহিম উদ্দিনের কাছে গেল। নিচু গলায় বলল,
“হুজুর, আমাকে সঠিক পথ দেখান।”
সবুজে ঘেরা চরকল্যাণপুরে সেদিন নতুন করে আশার বাতাস বইল।



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন