✍️জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল: দাখিল পাশ করে কলেজে ভর্তি হওয়া
✍️জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল: দাখিল পাশ করে কলেজে ভর্তি হওয়া
বর্তমানে অনেক দাখিল উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী দ্বিধার মুখে পড়ে যায়—মাদ্রাসায় থেকে আলিম পড়বে, না কি কলেজে গিয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হবে? অনেকেই ভাবেন, কলেজে গেলে হয়তো সামনে ভালো সুযোগ আসবে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, দাখিল পাশ করে কলেজে চলে যাওয়া জীবনের একটি বড় ভুল হতে পারে। কেননা—
১. সনদের মান সমান হলেও ভবিষ্যতের পথ আলাদা
আলিম (XI) ও কলেজের একাদশ শ্রেণির সনদের মূল্য এক হলেও গন্তব্য এক নয়। আলিম পাশ করার পর একজন শিক্ষার্থী চাইলেই সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় বা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়—উভয় স্থানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। পক্ষান্তরে, দাখিল পাশ করে কলেজে গিয়ে কেউ চাইলেও আর ইসলামি শিক্ষার ধারায় ফিরতে পারে না, যার দরজা তখন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
২. পরিবেশগত ব্যবধান
মাদ্রাসা ও কলেজের পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন। একজন ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা ছাত্র হঠাৎ করেই কলেজের মুক্ত পরিবেশে গিয়ে মানসিক অস্থিরতায় ভোগে। নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে গিয়ে তার পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে, যা ভালো ফলাফল অর্জনে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।
৩. কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা
মাদ্রাসা শিক্ষা অনেক কম খরচে সম্পন্ন হয়। সাধারণ শিক্ষায় যেখানে প্রাইভেট, কোচিং, নোটসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয়, সেখানে মাদ্রাসায় এই খরচ একেবারেই কম। এটি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়।
৪. আন্তরিক শিক্ষক ও ক্লাসভিত্তিক শিক্ষা
মাদ্রাসায় শিক্ষকেরা অধিক আন্তরিক। তারা নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন, ফলে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত প্রাইভেট পড়ার প্রয়োজন হয় না। শিক্ষার্থীরা একাডেমিক চাপমুক্তভাবে মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
৫. দ্বীনি ও দুনিয়াবি শিক্ষার সমন্বয়
মাদ্রাসায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, আইসিটি ইত্যাদি সাধারণ বিষয়ের পাশাপাশি কুরআন, হাদীস, আরবি, ফিকাহ প্রভৃতি বিষয় পড়ানো হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী ইসলামকে জানার, বোঝার ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার প্রকৃত সুযোগ পায়।
৬. উন্মুক্ত উচ্চশিক্ষার দরজা
আলিম পাশ করার পর শিক্ষার্থীরা ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো বিষয়ে ভর্তি হতে পারে। অর্থাৎ আলিম পাশ করেও সাধারণ শিক্ষার ধারায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব।
৭. চাকরির ক্ষেত্রে বিস্তৃত সুযোগ
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য বিসিএসসহ সরকারি-বেসরকারি চাকরির দিক উন্মুক্ত। পাশাপাশি ইমাম, খতিব, ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ থাকে, যা জেনারেল শিক্ষার্থীদের জন্য নেই।
৮. দ্বীনি দাওয়াত ও সমাজসেবা
একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী দাওয়াতি কাজ, ওয়াজ মাহফিল, ইমামতি, খতিবি ও সমাজে দ্বীনের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়, যা কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এভাবে মাদ্রাসা ছাত্রদের সমাজে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করার পথ সুগম হয়।
৯. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শ্রেষ্ঠত্বের পথে
আল্লাহ বলেন—
> كنتم خير أمة أخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির জন্য বের করা হয়েছে, তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো।" (সূরা আলে ইমরান: ১১০)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
> خيركم من تعلم القرآن وعلمه
"তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শেখায়।" (সহীহ বুখারী)
এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য দ্বীনি শিক্ষা অপরিহার্য। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সহজ, কারণ তাদের জন্য পথ প্রস্তুত করে দেওয়া হয়।
১০. দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ
মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা ইলমে ওহি অর্জন করে, যা মানুষকে দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতে মুক্তির পথ দেখায়। সাধারণ শিক্ষায় এসব জ্ঞান অর্জন করা কষ্টকর এবং অধিকাংশ সময় অধরা থেকে যায়।
উপসংহার
বর্তমানে দেশের আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে দাখিল, আলিম, ফাজিল, কামিল পর্যন্ত দ্বীনি ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। এ ব্যবস্থা একজন শিক্ষার্থীকে শুধু চাকরি নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ ও আল্লাহভীরু নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
তাই, একজন দাখিল পাশ করা শিক্ষার্থীর উচিত, মাদ্রাসায় থেকে আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে দ্বীন ও দুনিয়ার জ্ঞান একত্রে অর্জন করা। এটিই সফলতার প্রকৃত পথ।
রচনায় মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম 🌺
আরবি প্রভাষক বলদীআটা ফাজিল স্নাতক মাদ্রাসা ধনবাড়ী টাঙ্গাইল জেলা।
http//faridulislamjournal.blogspot.com



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন